২৬১ পণ্যের শুল্ক পরিবর্তন, লাভবান হবে কোন খাত

আপলোড তারিখঃ 2026-06-19 ইং
২৬১ পণ্যের শুল্ক পরিবর্তন, লাভবান হবে কোন খাত ছবির ক্যাপশন:

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ তার শুল্ককাঠামোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ জোরদার করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শতাধিক পণ্যে শুল্ক, ভ্যাট ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা শিল্প খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের দাবি। তবে অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও এলডিসি-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি ও সময়বদ্ধ শুল্ক সংস্কার রোডম্যাপ এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ দেশের শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে এবং এলডিসি-পরবর্তী বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করবে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু পরিবর্তন আনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো অনুপস্থিত।


এলডিসি উত্তরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ :
বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও সরকার অন্তত ৩ বছর সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছে, তারপরও উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বহু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা হারাতে হবে। বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পায়। এলডিসি মর্যাদা হারানোর পর এসব সুবিধা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার হবে। এ কারণে দেশের শিল্প খাতকে আরো দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে শুল্ক সুরক্ষার ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে।


কী কী পরিবর্তন আসছে :
প্রস্তাবিত বাজেটে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অঙ্গীকার পূরণের অংশ হিসেবে ৬৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সুপারিশ রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যমান ৯ স্তরের নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কাঠামোকে ছয় স্তরে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন হার ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হলেও উচ্চস্তরের ৩০ ও ৩৫ শতাংশ হার কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে। একইসঙ্গে ১১৩টি পণ্যের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে ভ্যাটমুক্ত ২০টি পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।


ন্যূনতম মূল্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন :
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কিছু পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্য ব্যবহার করা হয়। এতে আমদানিকারকরা কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিতে পারেন না। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এ ব্যবস্থাকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ১৪টি এইচএস হেডিংয়ের পণ্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হবে। তিনটি ক্ষেত্রে তা কমানো হবে এবং ২৭টি ক্ষেত্রে পুনর্নির্ধারণ করা হবে। একইসঙ্গে চারটি নতুন পণ্য শ্রেণিতে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০টি এইচএস হেডিং এ পরিবর্তনের আওতায় আসবে।


ডব্লিউটিও বাধ্যবাধকতা পূরণের চাপ :
বাংলাদেশে বর্তমানে ৭ হাজার ৬১১টি ট্যারিফ লাইন রয়েছে। এর মধ্যে ডব্লিউটিওর কাছে বাংলাদেশ ৯৫৫টি ট্যারিফ লাইনের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এসবের মধ্যে ৭৬৩টি কৃষিপণ্য এবং ১৯২টি অ-কৃষিপণ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ডব্লিউটিও নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি শুল্ক ধরে রেখেছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে শুল্ক সংস্কার এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।


‘পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রোডম্যাপ নেই’ :
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য যে ধরনের শুল্ক সংস্কার প্রয়োজন ছিল, বাজেটে তার আংশিক প্রতিফলন দেখা গেলেও একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা অনুপস্থিত। তার মতে, বাংলাদেশের শক্তিশালী উৎপাদন খাতের কারণে এক ধাক্কায় বড় ধরনের শুল্ক হ্রাস সম্ভব নয়। তবে আগামী তিন থেকে চার বছরে কীভাবে ধাপে ধাপে সুরক্ষা কমানো হবে, সে বিষয়ে সরকারকে একটি স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া উচিত ছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনায় গেলে উচ্চ শুল্ককাঠামো বজায় থাকলে বাণিজ্য বিকৃতির ঝুঁকি বাড়বে।


বিশ্লেষকদের মতে, এনবিআরের শুল্ক নীতিতে এখনো রাজস্ব আহরণের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ড. রাজ্জাকের ভাষায়, আমদানি শুল্ক কমালে রাজস্ব কমে যাবে- এমন ধারণা থেকেই এনবিআর অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাসে সতর্ক অবস্থান নেয়। তবে এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় শুধু রাজস্ব সুরক্ষার চিন্তা নয়, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। বাজেট ঘাটতির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন র‌্যাপিড চেয়ারম্যান ড. আবদুর রাজ্জাক। তার মতে, ঘোষিত ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাস্তব চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। তিনি বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং বৈদেশিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নিলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকৃত অর্থায়ন ঘাটতি প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।


ড. রাজ্জাকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ভরযোগ্য রাজস্ব আহরণ ও সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনা ছাড়া ব্যয় বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করেন, এবারের বাজেটে কিছু খাত; বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) শিল্প- নির্দিষ্ট সুবিধা পেলেও সামগ্রিক শুল্কনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। তাদের মতে, কোনো শিল্প খাতকে অনির্দিষ্টকাল উচ্চ শুল্ক সুরক্ষা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে সুরক্ষা কমিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের মতো অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যাবে না।


সামনে কী চ্যালেঞ্জ :
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তখন শুধু শুল্ক সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মতো কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠবে। তাদের মতে, এবারের বাজেট শুল্ক সংস্কারের একটি সীমিত সূচনা হলেও এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ এখনো অনুপস্থিত। আর সেই রোডম্যাপ ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অভিযাত্রা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)