ছবির ক্যাপশন:
‘কোর্ট অনুমোদিত’, ‘এক ফোঁটা তেলেই মিলবে পুরুষ শক্তির ম্যাজিক’, ‘মাত্র সাত দিনে গোপন দুর্বলতা দূর’, ‘কাজ না হলে টাকা ফেরত’- এমন চটকদার কথায় এখন সরগরম মেহেরপুরের বিভিন্ন গবাদি পশুর হাট। মাইকে জোরালো প্রচার, ভিড় জমিয়ে কৌশলী বক্তব্য আর লোক দেখানো ‘সফলতার গল্প’ শুনিয়ে বিক্রি হচ্ছে কথিত জোঁকের তেল, হারবাল যৌন শক্তিবর্ধক ও অনুমোদনহীন নানা ওষুধ।
হাটে হাটে ‘গোপন শক্তি’ বাড়ানোর নামে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর প্রতারণার বাজার। সাধারণ মানুষের লজ্জা, শারীরিক দুর্বলতা ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে চলছে প্রকাশ্য বাণিজ্য। চিকিৎসকদের ভাষ্য, অজানা উপাদানে তৈরি এসব তেল ও ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরেজমিনে মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ ক্যানভাসে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে জোঁকের তেল ও বিভিন্ন হারবাল ওষুধ কিনছেন। কেউ পশু বিক্রি করে ফেরার পথে এসব পণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিক্রেতাদের অধিকাংশেরই নেই কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বৈধ অনুমোদন। তবে নিজেদের ‘হাকিম’ বা ‘যৌন বিশেষজ্ঞ’ পরিচয় দিয়ে সহজেই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন তারা।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী হাটে দেখা যায়, জোঁকের তেল বিক্রেতা আব্দুস সালামের ক্যানভাস ঘিরে শত শত মানুষের ভিড়। প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেক ক্রেতাই দ্রুত সরে যান। এ সময় ওই বিক্রেতা বলেন, ‘আপনি এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আজ আমার আর ব্যবসা হবে না।’
তেল কিনতে আসা কয়েকজন ক্রেতা জানান, কেউ আগেও ব্যবহার করে উপকার পেয়েছেন বলে আবার কিনছেন, কেউ লোকমুখে শুনে এসেছেন। আবার কেউ বলছেন, ‘শখের বসেই কিনলাম, দেখি কাজ হয় কি না।’ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইউনানি শাস্ত্রে জোঁক দিয়ে চিকিৎসার ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। তবে সেখানে জীবন্ত জোঁক ব্যবহারের কথা থাকলেও ‘জোঁকের তেল’ দিয়ে চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জোঁকের তেল বিক্রেতা আব্দুস সালাম দাবি করেন, তাদের পরিবারে বংশপরম্পরায় এই তেল বিক্রির প্রচলন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার দাদা ও বাবাও জোঁকের তেল বিক্রি করতেন। আমিও গত ১৮ বছর ধরে কোরবানির মৌসুমে বামন্দী হাটে সপ্তাহে দুদিন তেল বিক্রি করি।’ তিনি জানান, বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই তেল তৈরি করা হয়। নারিকেলের শাঁসের সঙ্গে জোঁকের চর্বি পচিয়ে পরে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, কর্পূর, ঘি, তিলের তেল, ভেন্নার তেল, কালোজিরার তেল, জয়তুনের তেল ও সরিষার তেল মিশিয়ে দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়া হয়। তার দাবি, এই তেল ব্যথা, চর্মরোগ, এলার্জি, অর্শ এবং যৌনশক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকর।
এ বিষয়ে ২৫০ শয্যা মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আয়ুর্বেদিক বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন আলী বলেন, ‘জোঁকের তেল কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা উপশমে উপকার দিতে পারে। তবে কোনো ধরনের ব্যথায়, কী পরিমাণে এবং কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে, তা একজন প্রশিক্ষিত ইউনানি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বংশপরম্পরায় অনেকে এ ধরনের তেল বিক্রি করলেও উৎপাদন প্রক্রিয়া সঠিক না হলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। এতে চর্মরোগসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া রাস্তাঘাটে হারবাল যৌন শক্তিবর্ধক ওষুধ বিক্রির প্রবণতাও উদ্বেগজনক। এসব পণ্যে আদৌ কার্যকর ভেষজ উপাদান রয়েছে কি না, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।’ তার মতে, বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
