ছবির ক্যাপশন:
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহ জেলার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের আচরণ, মনোযোগ ও মানসিক স্থিরতায় ভয়াবহ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনে আসক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট শিক্ষার্থীদের আচরণে এক ধরনের ‘বেপরোয়া ভাব’ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টিকে ইতোমধ্যেই ‘অ্যালার্মিং’ বা চরম উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করছেন সচেতন মহল।
শিক্ষকেরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও শ্রেণিকক্ষে যে পরিবেশ ছিল, বর্তমানে তার সঙ্গে বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মধ্যে আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতির প্রতি এক ধরনের অনীহা ও অবাধ্যতা দেখা দিচ্ছে। শিক্ষক বা অভিভাবকদের শাসন না মানা, বড়-ছোটর ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া এবং তুচ্ছ কারণে বেয়াদবি করার মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মধ্যে এক ধরনের ‘বেপরোয়া ভাব’ ও অস্থিরতা কাজ করছে, যা সামাজিক শৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
জেলার সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার আনোয়ার হোসেন নামে এক শিক্ষক জানান, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা এখন আগের তুলনায় অনেক কঠিন। সামান্য বিরতিতেই তারা মোবাইল, গেম কিংবা শর্ট ভিডিও কন্টেন্টের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক শিষ্টাচারের চরম অভাব।
ঝিনাইদহ পৌর এলাকার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরি করা যেত। এখন শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি উদ্ধত। বড়দের সম্মান করা বা শিক্ষকের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে চরম গাফিলতি দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে ভার্চুয়াল জগতের আসক্তির পাশাপাশি বর্তমান সামাজিক অস্থিরতাও দায়ী।’
সরকারি কেশবচন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি অভ্যস্ত। ফলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে সমাজে যে শ্রদ্ধাবোধ ও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক থাকার কথা, তা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
যশোর অটিজম ও এনডিডি সেবা কেন্দ্রের মনোবিজ্ঞান কনসালট্যান্ট সাব্বির আহমেদ জুয়েল বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কিশোরদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তারা বাস্তব জীবনে খিটখিটে মেজাজের ও অবাধ্য হয়ে ওঠে। যখন তারা দেখে চারপাশের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবেশে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে, তখন তারা সেটাকে নিজের আচরণের অংশ করে নেয়।
ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা অফিসার লুৎফর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশের এই সন্ধিক্ষণে পরিবারকেই সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানদের কেবল স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না, তাদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য কাউন্সেলিং করতে হবে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জেলা প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। একটি সুস্থ ও সুশৃঙ্খল প্রজন্ম গড়তে শিক্ষক-অভিভাবক ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
