পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

বাটন টিপে রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু

আপলোড তারিখঃ 2026-04-29 ইং
পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ ছবির ক্যাপশন:

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে এখন বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যৎকেন্দ্রের চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম প্রবেশের মাধ্যমে কেন্দ্রটি একটি মাইলফলক অর্জন করল। জ্বালানি প্রবেশ সম্পন্ন এবং পারমাণবিক বিকিরণসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে ইউনিটটির পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টায় বিদ্যৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ‘রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেলে’ বাটন টিপে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং বা ‘ফিজিক্যাল স্টার্টআপ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ যৌথভাবে বাটন চেপে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর ক্লাবে প্রবেশ করল।


অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ডিরেক্টর মিস্টার ওয়েই শুয়াং, রোসাটমের ডেপুটি ডিরেক্টর মিস্টার আন্দ্রে পেট্রোভ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম, বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূত আলেকজেন্ডার খোজিন। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।


সভাপতির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজকে এই দিনটি ঐতিহাসিক। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘযাত্রার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যৎকেন্দ্র নয়, এটি আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জাতীয় আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এই প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত করার মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়া আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় রাশিয়া রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।


‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, আজ বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাতারে যোগ দিয়েছে। নিঃসন্দেহে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি মূল উপাদান হয়ে উঠবে। রোসাটমের জন্য, এই প্রকল্পটি বৈশ্বিক পারমাণবিক শিল্পের উন্নয়নে এবং আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা আমাদের বাংলাদেশী বন্ধুদের সাথে একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে একসাথে কাজ করতে পেরে আনন্দিত এবং আরও সহযোগিতার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।


স্বাগত বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মান ও নিরাপত্তা বজায় রেখে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তির নতুন দুয়ারে প্রবেশ করলো। রূপপুর থেকে এই রূপান্তর ভবিষ্যত প্রজন্মকে এগিয়ে নেবে। তিনি জানান, এক বছরে পাঁচটি ধাপ অতিক্রমের মাধ্যমে আজ প্রথম চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোডিং করা সম্ভব হলো। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা বাধা পেরিয়ে এই ফুয়েল লোড কার্যক্রম শুরু হলো। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করায় গত ১৬ এপ্রিল রূপপুর কর্তৃপক্ষকে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের লাইসেন্স প্রদান করা হয়। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। এক বছর পর প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে সেখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।


উৎপাদন শুরুর পথে এখন যা বাকি :
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানির (এনপিসিবিএল) ড. মো. জাহেদুল হাছান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রিঅ্যাক্টর ভবন, টারবাইন ভবন, কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং বিভিন্ন সহায়ক স্থাপনাসহ মোট ৩৮৯টি স্থাপনার একটি বিস্তৃত অবকাঠামোর ভৌত নির্মাণ কাজ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। রি-অ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয় এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। এ পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রি-অ্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে। পরীক্ষা শেষে রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% এ উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন। রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। এ স্টেজ ডি-ট্রায়াল অপারেশনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাতীয় গ্রিডে ইউনিটটির ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে।


উদ্যোগের ৬৫ বছর পর বাস্তবায়ন :
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে পরমাণু বিদ্যুকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার পর ১৯৬৩ সালে প্রস্তাবিত ১২টি এলাকার মধ্য থেকে বেছে নেয়া হয় রূপপুরকে। ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পারমাণবিক বিদ্যৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রায় ৫০ বছর আগের নেয়া সেই উদ্যোগ সক্রিয় করে তোলে। তখন প্রকল্পটির জন্য অধিগ্রহণকৃত ২৬২ একর জমিতেই বর্তমান কেন্দ্রটির মূল কমপ্লেক্স নির্মিত হচ্ছে। এখন সবমিলিয়ে প্রকল্পটির জন্য প্রায় ১ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।


২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্রটির নির্মাণ খরচের ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (১ লাখ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা) মধ্যে ১১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ঋণ সহায়তা হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। বাকি ১ বিলিয়ন ডলার জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ওই সাধারণ চুক্তিটি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের পরে কার্যকর হয়। বর্তমানে সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদের পর খরচ বেড়ে হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং কিছু উপখাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে। আর্থিক বিবেচনায় বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় প্রকল্প এটি। আইন অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের হাতে। আর কেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্বে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ’। কেন্দ্রটির লাইফ টাইম বা জীবনসীমা হচ্ছে ৬০ বছর। এই কেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য রাশিয়াই ফেরত নিয়ে যাবে।


ইউরেনিয়ামের যোগান আসবে যেভাবে:
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে। শুরুতে কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সাড়ে তিন টাকা বলা হলেও কয়েক বছর আগে তা ৬ টাকা ধরা হয়। বর্তমানে তা ১১-১২ টাকায় গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে জানা গেছে।


রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিভিত্তিক দুটি ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে; যার প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। আধুনিক কন্টেইনমেন্ট কাঠামো, কোর ক্যাচার এবং মাল্টি-লেভেল সেফটি ডিজাইনের সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক মানদন্ডে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)