চাহিদা বাড়ছে বিদ্যুতের, প্রকট হবে লোডশেডিং

আপলোড তারিখঃ 2026-04-02 ইং
চাহিদা বাড়ছে বিদ্যুতের, প্রকট হবে লোডশেডিং ছবির ক্যাপশন:

চলতি বছরের এপ্রিল থেকেই দেশে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুম শুরু হওয়া এবং শহরাঞ্চলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদার চাপ কয়েকগুণ বাড়বে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করেছে, যা গ্রামীণ এলাকায় আরও প্রকট হতে পারে। এদিকে জ্বালানি তেলের ঘাটতি, গ্যাস সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ভর্তুকির জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কৃষিতে সেচ সংকট, পরিবহন খাতে অস্থিরতা এবং পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি- সব মিলিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি আয় এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও গ্যাস আমদানির জন্য বাংলাদেশ ২৫০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক সহায়তা খুঁজছে বলে জানিয়েছে। খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে চাহিদা বাড়ছে বিদ্যুতের, নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রীষ্মকালীন সেচ মৌসুম শুরু হওয়ায় কৃষি খাতে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একই সঙ্গে তীব্র গরমে শহরাঞ্চলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় আবাসিক খাতেও চাহিদা বাড়বে। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে, যা লোডশেডিং বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তারা আরও সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বকেয়া পরিশোধে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ডলার সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।


তেলের ঘাটতির কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে এবং এলপিজি আমদানিতে প্রভাব পড়ায় গ্যাস সংকটও দেখা দিয়েছে। এতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিশেষ করে তেলনির্ভর খাত ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস সংকটে অনেক কারখানা আংশিক বা বন্ধ থাকায় রপ্তানি আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি খাতে ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পরিবহন খাতে জ্বালানির অভাবে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, বেড়েছে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যয়, যার প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে। জ্বালানি সংকটের ফলে সামগ্রিকভাবে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়ছে। একইসঙ্গে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি বাড়ায় সরকারের অর্থনৈতিক চাপ ও বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।


সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৪০ সালের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা তিনগুণ বেড়ে ৩১৬,৫০০ গিগাওয়াট ঘণ্টা হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে গবেষণায়। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা সময়মতো বাড়াতে ব্যর্থ হলে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গঠনের সুযোগ নস্যাৎ হতে পারে। তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ন্যায্য রূপান্তরের জন্য ২০৪০ সাল পর্যন্ত ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ বিনিয়োগ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮.৭২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী সময় ২০৩১-২০৪০ সময়কালে ২৪.১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে ১৭ডলারের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে আগামী ১৫ বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৫৫৭ বিলিয়ন ডলারের সামগ্রিক সুফল যুক্ত হবে, যা বছরে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সমান।


সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বড় অঙ্কের ভর্তুকি বকেয়া পরিশোধে অবশেষে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আটকে থাকা এই অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল) এবং বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)-এর বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিপরীতে জমে থাকা ভর্তুকি পরিশোধে দুই দফায় মোট ৫ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের জন্য ১ হাজার ৬২৩ কোটি ২১ লাখ টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্চের ৮ ও ১৫ তারিখে এসব অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) দীর্ঘদিন ধরেই এ বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধের জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। তবে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়।


সরকারি বিধি অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি কোনো আর্থিক প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা বা সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়েছে বলে জানা গেছে। মূলত বিদ্যুতের ট্যারিফ অনুমোদন না থাকায় গত বছরের মে মাস থেকে এ দুই বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকি আটকে ছিল। পরে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন পেলেও বিসিপিসিএল ও বিআইএফপিসিএলের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। এই দুই প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করে জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৪২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিসিপিসিএল ও বিআইএফপিসিএলের ক্ষেত্রে অনুমোদন জটিলতার কারণে অর্থ ছাড় আটকে ছিল। পরবর্তীতে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর সময়ের ভর্তুকি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৭৩ কোটির বেশি। এর সঙ্গে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির বকেয়া যুক্ত হয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)