ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ ডেস্ক: গুমের অভিযোগে যশোর কোতোয়ালি থানার সাত কর্মকর্তাসহ ১৬ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে দায়েরকৃত মামলাটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। আসামিদের সঙ্গে মিমাংসা হয়ে যাওয়ার কথা বলে হিরা খাতুন এই পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানান তার আইনজীবী অজিত কুমার দাস। গত বুধবার সকালে হিরা খাতুন তার আইনজীবী অজিত কুমার দাসের মাধ্যমে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলী আদালতের বিচারক শাহিনুর রহমান বরাবর মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। এর আগে ছেলেকে অপহরণ ও দাবি করা ঘুষের টাকা না পেয়ে তাকে হত্যা ও গুমের অভিযোগে যশোর কোতোয়ালি থানার ১৬ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার দুপুরে যশোরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন শহরের শংকরপুর এলাকার হিরা খাতুন। আদালত হিরা খাতুনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশও দিয়েছিলেন। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার হওয়ায় এ নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় আইনের লঙ্ঘন হয়েছে। এভাবে তড়িঘড়ি মামলা প্রত্যাহারে কোনো মহলের ভূমিকা থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। সাত মাস আগে পুলিশের হাতে আটকের পর নিখোঁজ ছেলের সন্ধান চেয়ে মঙ্গলবার যশোরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনুর রহমানের আদালত অভিযোগ দায়ের করেন যশোর শহরের শংকরপুর পশু হাসপাতাল এলাকার তৌহিদুল ইসলাম ওরফে খোকনের স্ত্রী হীরা খাতুন। পুলিশের বিরুদ্ধে এ মামলার পরই গোটা যশোরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নানাভাবে মামলার বাদিসহ পরিবারের সদস্যদের চাপ ও হুমকি প্রদান শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠে। এক পর্যায়ে বুধবার সকালে হীরা খাতুন একই আইনজীবীর মাধ্যমে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলি আদালতে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই মামলা প্রত্যাহারে আদালত অঙ্গনেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
হীরা খাতুনের আইনজীবী অজিত কুমার দাস জানান, ‘বাদী নিজে এসে মামলাটি প্রত্যাহার করতে চান। বাদী আবেদনে লিখেছেন, আসামিদের সঙ্গে মীমাংসা হওয়ায় এবং আসামিরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বুঝতে পেরে আমি এ মামলা চালাতে ইচ্ছুক নই। পরে বিচারক আবেদনটি গ্রহণ করেন।’ এদিকে, যশোর আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্যরা বলছেন, কোনো মহলের প্রভাবের কারণেই মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। তাছাড়া যে আদালত মামলা গ্রহণ করেছেন সেই আদালতই তদন্তে থাকা মামলা আইনগতভাবে প্রত্যাহার করতে পারেন না। যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম বাচ্চু বলেন, এই মামলায় যারা আসামি তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতার অধিকারী। এজন্য এই প্রত্যাহার নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। নিসন্দেহে বলা যায়, পেছন থেকে কিছু কাজ হয়েছে যার জন্যে এই মামলা প্রত্যাহার খুবই দ্রুততার সঙ্গে হয়েছে।
মানবাধিকার উন্নয়ন উদ্যোগ ফাউন্ডেশন পরিচালক (তদন্ত) অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম বলেন, যিনি মামলাটি করেছিলেন তিনি অসহায় স্বামী পরিত্যক্তা। এই মহিলার সন্তানকে আটকের পর সাক্ষাতের জন্য দেন দরবার ও খোঁজাখুঁজি শুরু করলে পুলিশ পাল্টা মামলা করে দাবি করে, পুলিশের কাস্টডি থেকে সে পালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন সন্তানের সন্ধান না পাওয়ায় হীরা খাতুন মানবাধিকার উন্নয়ন উদ্যোগ ফাউন্ডেশনের শরনাপন্ন হয়। এর প্রেক্ষিতে মামলা দায়ের হলে আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তভার প্রদান করে। ফলে মামলাটি তদন্তাধীন। এই আইনজীবী বলেন, ‘৩৬৪ ধারার মামলা দায়রা জজ ছাড়া জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচার করতে পারেন না। এই অবস্থায় তদন্তাধীন মামলা এই আদালত থেকে কিভাবে প্রত্যাহার হলো তা বোধগম্য নয়। এছাড়া আমরা শুনতে পাচ্ছি- অসহায় ওই মহিলার ওপর চাপ প্রয়োগ করে মামলা প্রত্যাহার করানো হয়েছে।’ আলোচিত এই মামলায় আসামি করা হয়, যশোর কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এইচএম শহিদুল ইসলাম, আমির হোসেন, হাসানুর রহমান, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রাজন গাজী, সেলিম মুন্সী, বিপ্লব হোসেন, সেলিম আহমেদ, কনস্টেবল আরিফুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, ড্রাইভার কনস্টেবল মো. রমজান, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান, আবু বক্কার, ড্রাইভার কনস্টেবল মিজান শেখ, কনস্টেবল মাহমুদুর রহমান, রাজিবুল ইসলাম, টোকন হোসেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ৫ এপ্রিল সকাল ১০ দিকে বাদীর ছেলে সাঈদ ও তার বন্ধু শাওন পৌর পার্কে বেড়াতে যান। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে সাক্ষী সাব্বির হোসেন ফোনে জানান- তার ছেলে সাঈদ ও শাওনকে পুলিশ ধরেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা দেখেন পুলিশ ওই দুজনকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। এরপর বাদী ও সাক্ষীরা যশোর কোতোয়ালি থানায় যান। কিন্তু তাদের থানার ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাদী ও সাক্ষীরা থানার সামনে বসে ছিল। তারপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ১ ও ২ নম্বর আসামি বাদীকে ডেকে ছেলেকে ছাড়াতে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা না দিলে ছেলেকে মেরে লাশ গুম করার হুমকি দেয়। সাক্ষীরা বাদীকে বোঝায় পুলিশকে টাকা দেয়ার দরকার নেই। আদালতে চালান দিলে সেখান থেকে জামিন নেওয়া যাবে। কিন্তু ৭ এপ্রিল পত্রিকার নিউজে তারা জানতে পারেন, সাঈদ ও শাওন পালিয়েছে।
থানায় ও আদালতে খোঁজ নিলে তারা জানায়, বাদীর ছেলে ও তার বন্ধু পালিয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ওই দুজনকে আসামি করা হয়েছে। এরপর বাদী আসামিদের কাছে গিয়ে ছেলের সন্ধান চাইলে খারাপ আচরণ করা হয়। কোনো উপায় না পেয়ে ৩০ মে বাদী সংবাদ সম্মেলন করেন। তাতেও কোনো সন্ধান মেলেনি। বাদীর ধারণা- ঘুষের দুই লাখ টাকা না দেওয়ায় আগামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে হত্যার পর লাশ গুম করেছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্না দিয়েও ছেলের সন্ধান পাননি। মঙ্গলবার আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে আদেশ দেন। কিন্তু মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাহারে করে নেয়া হলো।
