ছবির ক্যাপশন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘প্রশাসনের নিরপেক্ষতা’ ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এখন মুখোমুখি। বিএনপি মনে করছে, নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ জামায়াতের পক্ষ নেওয়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকছে না। আবার জামায়াতের দাবি, স্থানীয় কর্মকর্তারা বিএনপিকে সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে, পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নির্বাচনী কর্মকর্তারা বেশ চাপে পড়েছেন। অবশ্য বরাবরই ইসি বলছে, কোনো চাপের কাছে তারা মাথনত করবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তারপরও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠছে। গতকাল সোমবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রয়েছে। শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিটির সদস্য ড. আব্দুল আলিম বলেন, ‘প্রতিবারই নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে। ইসিতে আসা যাওয়া তাদের নিয়মিত কাজ থাকে। কিন্তু এবার দলগুলো ইসিকে অনেকটাই চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। তার মতে, ইসি শতভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন কিছু নয়।’ গত এক সপ্তাহে একাধিকবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সবশেষ গত ১৮ জানুয়ারি সবশেষ বৈঠক করেন তিনি। ইসির কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করেছিলেন তিনি। এখনো প্রতিদিন বিএনপি প্রার্থীরা ইসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করছেন।
আর জামায়াতও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনেছেন। গতকাল সোমবারও দলটির প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের প্রধান ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘ইসির স্থানীয় কর্মকর্তারা একটি বড় দলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন। ফলে, নির্বাচনের মাঠে সবার জন্য সামান সুযোগ নেই। বিশেষ করে নারী কর্মীদের মাঠে নামতে বিএনপি বাধা দিচ্ছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, ‘ধর্মকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটি নানান অপপ্রচারে লিপ্ত। আমাদের কর্মীরা তাদের অপ্রচার থেকে মানুষকে সচেতন করছেন। প্রশাসনের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন।’ ইসি ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিষয়ে বড় দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর বিষয়টি এখন বেশ আলোচনায়। বিএনপি নেতাদের ভাষ্যমতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৮ ও ৯ এবং ১৩ নভেম্বর ৫২ জেলায় ডিসি নিয়োগ করে সরকার। এছাড়া ২৬ নভেম্বর ১৭০ জন উপজেলা নির্বাচনী অফিসার (ইউএনও) এবং ১ ডিসেম্বর ৭৭ জন ইউএনও নিয়োগ করা হয়।
এছাড়া ২৬ নভেম্বর ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদায়ন করে সরকার। ২ ডিসেম্বর লটারির মাধ্যমে দেশের ৫২৭ থানায় ওসি নিয়োগ দেওয়া হয়। ৪ ডিসেম্বর ঢাকারও ৫০ থানায় ওসি রদবদল করা হয়। এছাড়া তফসিল ঘোষণার দিন ১১ ডিসেম্বর পুলিশের ৩০ ডিআইজি ও ৯ অতিরিক্ত ডিআইজিকে বদলি করা হয়। অতীতের নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বেশির ভাগ কর্মকর্তাকে ফের বদলি করা হয়। প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রমাণে অনেক ক্ষেত্রে সামান্য অভিযোগ পেলেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নজির থাকলেও এবার তেমন চিত্র দেখা যায়নি। বিএনপি মনে করে, তফসিলের দিন পর্যন্ত পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশটি ‘জামায়াতের’ অনুগত। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালটে নিজেদের প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিচের দিয়ে ছাপানো এবং প্রবাসীদের মাঝে তা বিতরণে ব্যাপক ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠার পর বিএনপি নড়চেড়ে বসে।
বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসন ঢেলে সাজানোর কথা থাকলেও সেটি আসলে ‘বিশেষ কারণে’ ইসি করেনি। অবশ্য জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে একটি দলের শীর্ষ নেতাকে ঘিরে সরকারের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রটোকল দেওয়ার প্রবণতা নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়া বিএনপির পক্ষে কোনো কোনো কর্মকর্তা কাজ করছে বলেও অভিযোগ তার। এখনো মাঠ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।’ গত বছরের ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনের বাইরে। তাই বড় দল বিএনপি ও জামায়াতের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ কী হবে তা নিয়ে ভোটার এবং জনসাধারণের মাঝে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
