ছবির ক্যাপশন:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। পিছিয়ে ছিলেন না স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে গতকাল সোমবার দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। সকাল থেকেই আঞ্চলিক ও জেলা নির্বাচন কার্যালয়গুলোতে প্রার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শেষ দিনে যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নির্বাচন কার্যালয়গুলোর আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। সার্বিকভাবে মনোনয়নপত্র দাখিলের কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় আর বাড়ানো হবে না। তফসিল অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৫টার মধ্যেই সারা দেশের সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পরিবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের প্রত্যাশা রেখেছেন প্রার্থীরা। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি ও অন্যান্য দল নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিএনপি সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। জাতীয় পার্টি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে নির্বাচনে থাকার কথা জানিয়েছে। জোটে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৭২ আসনে এককভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অনিশ্চয়তা দুটোই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন জানায়, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য মোট ৩ হাজার ৪০৭টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ করে, যার মধ্যে ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর বিভাগে ৮টি জেলা ও ৩৩টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে মোট ৩৩৮টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়, যার মধ্যে ২৭৮টি দাখিল করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ৮টি জেলা ও ৩৯টি আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে ৩২৯টি এবং দাখিল হয়েছে ২৬০টি। খুলনা বিভাগে ১০টি জেলা ও ৩৬টি আসনের জন্য ৩৫৮টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ এবং ২৭৬টি দাখিল করা হয়। বরিশাল বিভাগে ৬টি জেলা ও ২১টি আসনে তুলনামূলক কম আগ্রহ দেখা গেছে; সেখানে ২১২টি মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিপরীতে দাখিল হয়েছে ১৬৬টি। ফরিদপুর বিভাগে ৫টি জেলা ও ১৫টি আসনে ১৬৫টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ এবং ১৪২টি দাখিল হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে ঢাকা বিভাগে। ৬টি জেলা ও ৪১টি সংসদীয় আসনের এই বিভাগে সর্বাধিক ৬৩৮টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়, যার মধ্যে ৪৪৪টি দাখিল হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে ৬টি জেলা ও ৩৮টি আসনে ৪০২টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ এবং ৩১১টি দাখিল করা হয়। সিলেট বিভাগে ৪টি জেলা ও ১৯টি আসনের বিপরীতে ১৭৬টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ এবং ১৪৬টি দাখিল হয়েছে। কুমিল্লা বিভাগে ৬টি জেলা ও ৩৫টি আসনে মনোনয়নপত্র গ্রহণের সংখ্যা ছিল ৪৯৬টি এবং দাখিল হয়েছে ৩৬৫টি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৫টি জেলা ও ২৩টি আসনে ২৯৩টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হলেও দাখিল হয়েছে ১৯৪টি।
নির্বাচনি সময়সূচি অনুযায়ী, জমা পড়া এসব মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শুরু হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে, যা চলবে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর আপিল দায়ের, নিষ্পত্তি এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সব ধর্মের মানুষদের নিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চাই। অনেকেই বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা অতীতেও কোনো বিভেদ করিনি, সামনেও করব না। নিজের ধর্মের প্রতি যেমন আমরা আনুগত্য প্রকাশ করি, ঠিক একইভাবে অন্যের ধর্মের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ২৪-এর আন্দোলনে অনেক তাজা প্রাণ হারিয়েছি। এই যে এত যুদ্ধ, শুধু একটি সুন্দর সমাজের জন্য। দুর্নীতিকে বাদ দিয়ে আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে চাই।’ বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এবারের নির্বাচনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সত্যিকার অর্থে উদারপন্থি একটি গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠা করার। যেখানে নারী-পুরুষ সবার সমমর্যাদা থাকবে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলে যেন আমরা সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি।’
খালেদা জিয়ার ৩ আসনেই বিকল্প প্রার্থী রাখছে বিএনপি :
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার যে তিনটি আসনে নির্বাচন করার কথা, সেগুলোতে বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রেখেছে দলটি। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১ এই তিন আসনেই বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া-৭ (গাবতলী) আসনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টন এবং দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আর ফেনী-১ (ফুলগাজী-পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম (মজনু)। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশনায় তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। চূড়ান্ত নির্দেশনা পাওয়ার পর মনোনয়নপত্র জমা দেবেন।
ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে তারেক রহমানের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা :
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমানের পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপির প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আব্দুস সালাম। ঢাকা-১৭ ছাড়াও বগুড়া-৬ আসনে তারেক রহমানের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা। তারেক রহমান নির্বাচনে প্রার্থী হতে ভোটার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন শনিবার। আর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন রোববার।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে চায় জাপা :
নিরাপত্তা, ভোটাধিকার, ভোটের মাঠে সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। গতকাল সোমবার বিকালে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে, প্রার্থীদের নিরাপত্তা থাকে, ভোটারদের নিরাপত্তা থাকে, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিশ্চিতে ভোট দিতে পারবে- এই আশ্বাস, এই গ্যারান্টি যদি পাই, তাহলে জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকবে। তবে আমরা অনুভব করছি, বিভিন্ন জায়গায় আমাদের নেতাকর্মীদেরকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ রকম অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এসব বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। যদি এই রকম অবস্থা চলমান থাকে। তখন আমাদের পার্টির ভেতর থেকে প্রচণ্ড চাপ আসবে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার।’ জাপা মহাসচিব বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করতে চাই। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আমাদের নিরাপত্তা, ভোটাধিকার, সমান অধিকার ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) ও গাইবান্ধা-৪ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাপা মহাসচিব। শামীম হায়দার পাটোয়ারী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘রাতের ভোট যেন না হয়, মিডিয়া ক্যু যেন না হয়, পূর্ব নির্ধারিত ফলাফলের ভোট যেন না হয়- এমনটিই আমরা আশা করি। আজকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট। বর্তমান সরকার যদি একটি সুষ্ঠু ভোট করতে পারে, তাহলে সংকট সমাধানের পথের দিকে বাংলাদেশ যাবে। আর যদি সুষ্ঠু ভোট করতে না পারে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।’
আসন সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ২৭২ আসনে প্রার্থী ইসলামী আন্দোলনের :
জামায়াতে ইসলামীসহ ১০টি দলের নির্বাচনি সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৭২ আসনেই এককভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গতকাল সোমবার ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
৪৭ আসনে এনসিপির মনোনয়নপত্র জমা :
সারা দেশে ৪৭ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থীরা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাগরিক পার্টির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আমাদের ৪৭টা নমিনেশন সাবমিট হয়েছে। আমাদের আসন সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই এটা চূড়ান্ত হবে। আমরা কিছুটা বাড়িয়েই সাবমিট করেছি। যেহেতু কিছু বাতিল হতে পারে। দলের স্বার্থে যারা এবার নির্বাচন করবে না, তাদের দল পরে মূল্যায়ন করবে বলা জানিয়েছেন নাহিদ। তিনি বলেন, এনসিপি সারা দেশে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার পক্ষে কাজ করবে এবং জোটের পক্ষে কাজ করবে। দলের স্বার্থে আমরা যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে। যারা দলের স্বার্থে ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ করেছে, সেটা দল অবশ্যই মূল্যায়ন করবে।
জামায়াতের জোটে যোগ দিচ্ছে এবি পার্টি :
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমন্বয়ে গঠিত জোটে যোগ দিচ্ছে তার দল। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দানের পর ঢাকা গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করা হবে। গতকাল সোমবার বরিশাল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আরও বলেন, ইতোমধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা আলোচনা হয়েছে। আরও কয়েকটি আসন নিয়ে আলোচনা চলছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করা হবে। তিনি বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
