স্বর্ণ চোরাচালানের ‘হট রুট’ দর্শনার নাস্তিপুর-ছয়ঘরিয়া সীমান্ত

২ কেজি স্বর্ণের চালান গায়েব, যুবককে রাতভর নির্যাতন

আপলোড তারিখঃ 2025-12-10 ইং
স্বর্ণ চোরাচালানের ‘হট রুট’ দর্শনার নাস্তিপুর-ছয়ঘরিয়া সীমান্ত ছবির ক্যাপশন:

দর্শনার সীমান্তবর্তী নাস্তিপুর-ছয়ঘরিয়া সীমান্তে স্বর্ণের একটি চালান গায়েব হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা আর রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়- এ যেন স্বর্ণ চোরাচালান নেটওয়ার্কের ভেতরের লুকানো প্রতিযোগিতা হঠাৎ বাইরে এসে পড়েছে। স্বর্ণের চালান গায়েব, মোটরসাইকেলযোগে অজ্ঞাত ব্যক্তির হ্যান্ডকাপ পরানো, রাতভর আটকে রাখা, ঘর-বাড়িতে হামলা, হাতুড়িপেটা করে বাবা ও ছেলেকে নির্যাতন, সবমিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।


ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, দর্শনা থানাধীন পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের জিরাট গ্রামের যুবক রায়হান (২৭)। কয়েক হাজার টাকার জন্য স্বর্ণ বহনের কাজে জন (লেবার) হিসেবে কাজ করেন। বিষয়টি তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, মূল ঘটনার পর তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।


রায়হানের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২০ নভেম্বর সকালে নাস্তিপুর গ্রামের আক্তারুলের ছেলে নাজমুল এবং আজগারের ছেলে বাবু যুবক রায়হানের কাছে দর্শনা মেমনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছ থেকে আনুমানিক ২ কেজি স্বর্ণের বার দেন এবং রায়হান সেগুলো নাস্তিপুর সীমান্তে পৌঁছে দেন। মাত্র ৪-৫ হাজার টাকার হাজিরায় লেবার হিসেবে স্বর্ণ ভারতে পৌঁছে দেয়ার সহযোগিতার কাজে যুক্ত হন রায়হান। তার ভাষ্যমতে, এটি ছিল তার দ্বিতীয় দিনের কাজ। তার দায়িত্ব ছিল দর্শনা থেকে নাস্তিপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া। পরবর্তীতে ২৩ নভেম্বর দর্শনার একই জায়গা থেকে নাজমুল ও বাবুর কাছ থেকে রায়হান আবারও ১ কেজি ২০০ গ্রামের ছয়টি স্বর্ণের বার গ্রহণ করে। কিন্তু এ যাত্রায় তার ভাগ্য প্রসন্ন ছিল না।


রায়হান বলেন, স্বর্ণগুলো নিয়ে ছয়ঘরিয়া সীমান্তের একটি স্কুলের পাশ ঘেষে যাওয়ার সময় দুটি মোটরসাইকেলে পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে তুলে নেয় এবং হেলমেট পরিয়ে অন্ধকার করে রাখা হয় তাকে। রাতভর প্রায় ৮ ঘণ্টা আটকে রেখে, বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে রঘুনাথপুর এলাকায় তাকে ফেলে যায় তারা। কিন্তু স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়ে যায় অজ্ঞাত দলটি। হ্যান্ডকাপের মতো সরঞ্জাম সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকে। কিন্তু দলটি কোনো পরিচয় দেয়নি, সিসিটিভিতে দেখা গেছে সিভিল পোশাকে। এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাহলে তারা কারা ছিল? অভ্যন্তরীণ চোরাচালান সিন্ডিকেট? নাকি অন্য কোনো শক্তি? কিংবা কোনো বাহিনীর পরিচয় ব্যবহারকারী চক্র?


এ ঘটনার পরদিন নাজমুলদের এক সহযোগী ওই পাঁচজনকে সনাক্তের জন্য রায়হানকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখানোর কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। এরপর প্রথমে দর্শনা, সেখান থেকে কুষ্টিয়া থানাপাড়া এলাকার একটি দোতলা বাড়ি নিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করার চেষ্টা। পাশের রুম থেকে একজন ঢুকে পড়ায় সুযোগে রায়হান দোতলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালাতে সক্ষম হয়।


রায়হান অভিযোগ করেন, নাজমুল ও বাবু এক লাখ টাকায় গুন্ডা ভাড়া করে তাকে তুলে নেওয়া ও হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। ৫ ডিসেম্বর দুপুরে দর্শনা থেকে ৭-৮ জন সশস্ত্র ব্যক্তি রায়হানের বাড়িতে হামলা চালায় এবং রায়হান ও তার বাবা খাইরুলকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। তবে তারা ব্যর্থ হলে রায়হান ও তার বাবাকে হাতুড়িপেটা করে গুরুতর আহত করে। যা গ্রামবাসীর সামনে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। এসময় তারা বলে- ‘নাজমুল এক লাখ টাকা দিছে, তুই ২ লাখ দিলে তোর পক্ষ নেব।’


এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সেই সাথে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। এ ঘটনার পর ৯৯৯ নম্বরে কলের মাধ্যমে দর্শনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। দর্শনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আশিক বলেন, স্বর্ণের চালান আত্মসাৎকে কেন্দ্র করে মালিকপক্ষ রায়হান ও তার বাবাকে মারধর করেছে বলে জানতে পারি। তবে দর্শনা থানার ওসি (তদন্ত) সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’
নাস্তিপুর-ছয়ঘরিয়া এখন স্বর্ণচোরাচালানের নিরাপদ রুট। গত ছয় মাসে একই এলাকায় স্বর্ণ, রুপা ও চোরাচালানের মালামাল জব্দের ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এ রুটটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত কয়েক মাসে দর্শনা থানায় স্বর্ণ, রুপা চোরাচালান সংক্রান্ত চারটি মামলা পর্যালোচনা করলে এসব তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের গত ৭ আগস্ট ঈশ্বরচন্দ্রপুরে বিজিবির অভিযানে ২ কেজি ৪৫১.০৯ গ্রাম স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় একজন আসামি (মামলা নম্বর ০৫, জিআর-১৩৭, তারিখ: ০৮/০৮/২০২৫, ধারা: ২৫ই(১)(ধ), ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎং অপঃ ১৯৭৪।


২৬ আগস্ট ছয়ঘরিয়া সীমান্তে ১ কেজি ১৬৫.০৩ গ্রাম স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় আসামি ৪ জন (মামলা নম্বর ১৪, জিআর-১৪৬, তারিখ: ২৬/০৮/২০২৫, ধারা: ২৫ই(১)(ধ)/২৫উ। ২৬ জুলাই আজিমপুরে ১০ কেজি ৮৩৪ গ্রাম চান্দি রূপা জব্দের ঘটনায় ২ জন আসামি (মামলা নম্বর ১৪, জিআর-১৩২, তারিখ: ২৬/০৭/২০২৫, ধারা: ২৫ই(১)(ন)। এবং ২৯ সেপ্টেম্বর কামারপাড়ায় ৩৫০.১২ গ্রাম স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় আসামি ৫ জন (মামলা নম্বর ১৩, জিআর-১৫৯, তারিখ: ৩০/০৯/২০২৫, ধারা: ২৫ই(১)(ন)।


এসব মামলার ধারাবাহিকতা বলে দিচ্ছে- নাস্তিপুর-ছয়ঘরিয়া সীমান্তপথ স্বর্ণচোরাচালানের অন্যতম সক্রিয় রুট। গ্রামবাসীর অভিযোগ, নাজমুল ও বাবু দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তমুখী স্বর্ণচোরাচালান চক্রের বিশেষ ভূমিকায় আছে। তারা টার্গেট ডেলিভারি এবং রুট সেফটি দেখাশোনা করে থাকে। স্থানীয়রা মন্তব্য করে বলেন, রায়হান কি বলির পাঠা? নাকি চালান আত্মসাৎ করেছে? দুটো পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন দাবি করছে। রায়হানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি লেবার, চালান বহন করেছে, অজ্ঞাত দলের হাতে চালান গায়েব হয়েছে। এরপর পরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা তাকে ‘চোর’ বানানোর চেষ্টা চলছে। আর নাজমুল-বাবুর পক্ষে গ্রামবাসীর দাবি, রায়হান চালান আত্মসাৎ করেছে, তাই তাকে ধরে চালান উদ্ধার করতে চেয়েছিলো। কিন্তু আসল প্রশ্ন, গায়েব হওয়া ছয়টি

স্বর্ণবার এখন কোথায়?
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপ্স) জামাল আল নাসের বলেন, ‘বিষয়টি আপনারা জানালেন। আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ চুয়াডাঙ্গা বিজিবি-৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহিদ হাসান বলেন, ‘ঘটনাটি আমার জানা নেই। বিষয়টি আমরা তদন্ত করব।’

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)