ছবির ক্যাপশন:
সাকিব আল হাসান:
চুয়াডাঙ্গা জেলায় এবার শীত নেমে এসেছে আগেভাগেই। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে দ্রুত। কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে শহর ও আশপাশের এলাকা। চলতি নভেম্বরের ২৩ তারিখ থেকে এ জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি বা তার নিচে অবস্থান করছে। দিনের বেলায় তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও রাত নামলেই জেঁকে বসছে শীত। এমন হাড় কাঁপানো শীতে যখন সাধারণ মানুষ নিজ বাড়িতে কম্বলের নিচে আশ্রয় নেয়, ঠিক তখনই শীত ভেঙ্গে শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন চুয়াডাঙ্গার নৈশপ্রহরীরা।
দিনের আলো নিভে গেলে তাদের কর্মঘণ্টা শুরু হয়, আর শেষ হয় ভোরের প্রথম আলো ফুটলে। চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজার, হাসপাতাল রোড, কোর্ট মোড়, স্বর্ণ পট্টি, সিনেমা হল পাড়াসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন সর্বত্রই তাদের নিরবচ্ছিন্ন টহল। পেশাগত দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা আর পরিবার চালানোর সংগ্রাম দুই মিলিয়ে এই রাতজাগা মানুষদের জীবন যেন কনকনে শীতের মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকা এক লড়াই।
রাত একটার দিকে পৌর শহরের কোর্ট মোড়ে দেখা মিলল সাইফুল ইসলাম ওরফে গ্যাদা নামে এক নৈশপ্রহরীর। গায়ে পুরোনো চাদর, হাতে একটি শক্তিশালী টর্চ, কাঁধে লাঠি। শীতে তার ঠোঁট ফেটে গেছে, হাতে-পায়ে কাঁপুনি থামছে না। কিন্তু প্রহরার কাজ বন্ধ নেই। নৈশপ্রহরী সাইফুল ইসলাম গ্যাদা বলেন, ‘শীতে কাজটা অনেক কষ্টের ভাই। রাত যত গভীর হয়, ঠান্ডা ততই বাড়তে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকা তো লাগবেই। না দাঁড়ালে এই এলাকার দোকান-পাট, মার্কেট নিরাপদ থাকবে কীভাবে?’
শহরের শহীদ হাসান চত্বর সংলগ্ন স্বর্ণ পট্টিতে দায়িত্বে থাকা নৈশপ্রহরী সিরাজ শেখ বলেন, ‘টানা টহলে অনেক সময় হাত-পা অবশ হয়ে আসে। তবুও চোখ বন্ধ করার সুযোগ নাই। আমাদের ওপর ভরসা করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রেখে মানুষ শান্তিতে ঘুমায়, তাই আমরা ঘুমালে হবে না। পুরো রাত নজরদারিতে থাকতে হয়।’
তবে নৈশপ্রহরীদের অনেকেই মাস শেষে পান মাত্র ন্যূনতম বেতন। সেই আয়ে পরিবারচালানোই যেখানে কষ্টকর, সেখানে শীতের বাড়তি ব্যয় তাঁদের জন্য আরও চাপ সৃষ্টি করে। গরম জ্যাকেট, মাফলার, টর্চ সবই কিনতে হয় নিজেদের টাকায়। তাই খুব কষ্টসাধ্য হয়ে যায় সংসার চালাতে হয় তাদের। চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার পলাশ পাড়া মোড়ের নৈশপ্রহরী মঙ্গল বিশ্বাস বলেন, ‘প্রতিবার শীতে অনেকভাবে কম্বল উপহার পায়। এখন দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকায় কেউ কোনো শীতবস্ত্রের সহায়তা করছে না।’
কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো শীতবস্ত্র বা বিশেষ সহায়তার কথাও খুব একটা শোনা যায় না। কেউ পুরোনো সোয়েটার পরে থাকেন, কেউ আবার বিগত বছরে পাওয়া পুরোনো কম্বল দিয়ে বাতাস ঠেকানোর চেষ্টা করেন। শহরের বিভিন্ন মোড়ে মাঝরাতে দেখা যায় ছোট ছোট আগুনের আঁচ। সেই আগুনের চারপাশে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নৈশপ্রহরীরা। কিছুটা উষ্ণতা পেলেও ঠান্ডার সঙ্গে যুদ্ধটা শেষ হয় না।
চুয়াডাঙ্গায় দিন দিন বাড়ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণকাজ, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার সংখ্যা। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বও বেড়েছে। প্রতিদিনের নিরবচ্ছিন্ন প্রহরার ফলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, আর সেই দায়িত্ব পালন করেন এই নৈশপ্রহরীরা। তাদের কাজের মূল্য সমাজে অনেক, কিন্তু আলোচনা খুবই কম। নৈশপ্রহরীদের ভাষায়, ‘শীত আমাদের কাজ থামায় না, শুধু কষ্টটা একটু বাড়িয়ে দেয়।’
