ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় বিষাক্ত স্পিরিট পানে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আরও তিনজন দিনমজুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহতদের সবাই নিম্নআয়ের দিনমজুর এবং নিকটস্থ পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ বাজার এলাকায় ৯ জন দিনমজুর একসাথে অ্যালকোহল পান করেন। এরপর দুইি দনে একে একে পাঁচজন মারা গেলেও অ্যালকোহল পানের বিষয়টি সামনে আসেনি। গতকাল রোববার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যুর পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ বাজার এলাকায় কয়েকজন মিলে স্পিরিট পান করেন। নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার পর থেকে শুরু হয় পেট ব্যাথা। সকলেই পরিবারের কাছে স্পিরিট পানের বিষয়টি গোপন করে পেটবাথ্যা বা গ্যাসের সমস্যার কথা জানান। এর মধ্যে সদর উপজেলার নফরকান্দি গ্রামের পূর্বপাড়ার মৃত নিজাম উদ্দীনের ছেলে ভ্যানচালক খেদের আলী (৪০) শুক্রবার দিনগত রাত ১২টার দিকে এবং খেজুরা গ্রামের হাসপাতালপাড়ার মৃত দাউদ শেখের ছেলে মোহাম্মদ সেলিম (৪০) ভোররাতে মারা যান।
শনিবার সকালে নিজ নিজ গ্রামের কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। শনিবার বেলা ১১টার দিকে পিরোজখালি গ্রামের স্কুলপাড়ার কাশেম আলীর ছেলে মোহাম্মদ লাল্টু ওরফে রিপু (৩০) মারা যান। নিজ গ্রামের কবরস্থানে তাকেও দাফন করা হয় শনিবার বাদ আসর। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হলেও অন্যরা অ্যালকোহল পানের বিষয়টি পরিবারের কাছে গোপন রাখেন। এরপর ডিঙ্গেদহ বাজারের শংকরচন্দ্র গ্রামের মাঝেরপাড়ার নবীছউদ্দীন মোল্লার ছেলে মোহাম্মদ শহীদ মোল্লা (৪৫) শনিবার বেলা তিনটার দিকে মারা যান। তাকে বাদ আসর গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। তখনো বাকিরা পরিবারের কাছে অ্যালকোহল পানের বিষয়টি বলেননি।
এরপর গতকাল রোববার সন্ধ্যায় শ্রমিক সরদার ও ডিঙ্গেদহ এশিয়া বিস্কুট ফ্যাক্টরি পাড়ার আফজেল আলীর ছেলে মোহাম্মদ লাল্টু (৫২) গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তিনি চিকিৎসকের কাছে অ্যালকোহল পানের বিষয়টি জানান। এরই মধ্যে আরও একজন ভর্তি হন সদর হাসপাতালে। তখন পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পেরে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় গিয়ে অবহিত করেন। রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে ভর্তিরত অবস্থায় মোহাম্মদ লাল্টু মারা যান এবং ডিঙ্গেদহ গ্রামের টাওয়ারপাড়ার মৃত সমসের আলীর ছেলে মোহাম্মদ সমির (৫৫) রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজ বাড়িতে মারা যান।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রোববার দিনগত রাত ২টা পর্যন্ত এ ঘটনায় আরও একজন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, একজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে এবং একজন পলাতক রয়েছেন।
নিহত সমির শেখের ছেলে সুজন আলী বলেন, ‘আমি শুনেছি, আমার বাবা নেশাগ্রস্ত ছিল। তিনি একা নন, আরও পাঁচজন একই ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছে। আজ (রোববার) সকালে বাবা বাড়িতে অবস্থানকালেই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। তবে আটটার দিকে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে সাড়ে আটটার দিকে তিনি মারা যান।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই বাজারে অবৈধভাবে দেশি মদ বিক্রি চলছে। প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা। ডিঙ্গেদহ বাজারের ব্যবসায়ী মো. ইমরান বলেন, ‘আমাদের এলাকার ছয়জন খেটে খাওয়া দিনমজুর বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে মারা গেছেন। ঘটনাটি গ্রামের মানুষদের হতবাক করেছে। এই ডিঙ্গেদহ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে নেশার ভয়াবহতা সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল থেকে কলেজ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। প্রশাসন যদি এ বিষয়ে শক্ত অবস্থানে থাকতো, তাহলে এমন ঘটনা ঘটতো না। মৃত্যুর পর এই বাজারে পুলিশ ছেয়ে গেছে, কিন্তু আগে এত তৎপরতা কখনো দেখা যায়নি।’
অ্যালকোহল পানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আলিম উদ্দীন বলেন, ‘লেবার সর্দার লাল্টু অ্যালকোহল এনেছিলেন। শুক্রবার রাতে আমরা অনেকে একসঙ্গে বসে খেয়েছিলাম।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আফরিনা ইসলাম বলেন, ‘রোববার বিকেল ৫টার দিকে পরিবারের সদস্যরা লাল্টু মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। তারা জানান, তিনি দুদিন আগে স্পিরিট পান করেছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রাত আটটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে বেলা তিনটার দিকে আলিম উদ্দীন নামের অপর একজন জরুরি বিভাগে আসেন। তিনিও অ্যালকোহল পান করেছিলেন, তাকেও ভর্তি রাখা হয়। তার অবস্থা অনেকটা স্বাভাবিক, তবুও তার বিষয়ে নিশ্চিত করে বিছু বলা যাবে না।’
এদিকে, রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ডিঙ্গেদহ বাজার এলাকায় সাংবাদিকদের চুয়াডাঙ্গা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জামাল আল নাসের বলেন, ‘সন্ধ্যায় সদর থানায় এসে দুজন তথ্য দেন ডিঙ্গেদহ বাজারে কয়েকজন লোক অ্যালকোহল পান করেছে, এর মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। পরবর্তীতে আমরা সদর হাসপাতালে একজনের মৃত্যুর তথ্য পায়। সেখানে চিকিৎসকের সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ অ্যাকোহল পয়জেনিং লেখা ছিল। এর পরপরই আমরা ডিঙ্গেদহে অনুসন্ধানে এসে অ্যালকোহল পানে ছয়জনের মৃত্যুর খবর সম্পর্কে জানতে পারি। যার মধ্যে চারজনের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। হাসপাতালে মারা যাওয়া একজন এবং রোববার রাত সাড়ে আটটায় মৃত্যু হওয়া আরেকজনের মরদেহ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তারা এই অ্যালকোহল পান করে। এর মধ্যে ৬জন মৃত্যুবরণ করেছে, আরও তিনজন অসুস্থ। তাদের মধ্যে দুজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর বাইরেও যদি কেউ এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, আমরা তাকে খুঁজে বের করব। আমাদের তদন্ত অব্যহত রয়েছে। এই অ্যালকোহল বা অ্যালকো কোথা থেকে বা কীভাবে এসেছে, সে সম্পর্কে জানতেও আমাদের তদন্ত চলছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমরা পরবর্তীতে জানাবো।’
