ছবির ক্যাপশন:
নাজমুল সামি:
চুয়াডাঙ্গায় হঠাৎ করে বেড়ে গেছে চর্মরোগে ‘স্ক্যাবিস’ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন শতাধিক মানুষ শরীরজুড়ে চুলকানি, ঘা, খোসপাঁচড়া এবং ফুঁসকুড়ির সমস্যায় চিকিৎসা নিতে আসছেন। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। রয়েছে ওষুধের তীব্র সংকটও।
গতকাল বুধবার সকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ২০৭ নম্বর রুমের সামনে দেখা গেছে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। নারী-পুরুষ ও শিশুসহ সব বয়সী রোগীরা চিকিৎসা নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। চিকিৎসকদের মতে, স্ক্যাবিস একটি ছোঁয়াচে চর্মরোগ এবং এটি পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অনায়াসেই ছড়িয়ে পড়ছে অন্য সদস্যদের মধ্যে। শিশুরা সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা জীবননগরের রোজা খাতুন জানান, ‘দুই হাতের আঙ্গুলে ফুঁসকুড়ির মতো বের হয়েছে। সকাল থেকে হাসপাতালে এসেছি, এখন প্রায় দুপুর, এখনও সিরিয়াল পাইনি। এত লম্বা লাইন, বসার জায়গাও নেই। গরমে মনে হচ্ছে সারাগায়ে চুলকানি হচ্ছে।’ কথা হয় শরীরে স্ক্যাবিসের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শান্ত হক নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শরীরের বেশকিছু স্থানে চুলকানোর কারণে ক্ষত হয়ে যাচ্ছে। এক মাস আগ হঠাৎ করেই হাত চুলকাতে শুরু করে। পরবর্তীতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। সদর হাসপাতালের চিকিৎসক বিভিন্ন ওষুধ লিখে দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসক এক মাসের ওষুধ দিয়েছেন আর এক মাস পর আসতে বলেছেন। প্রেসক্রিপশনে যা ওষুধ লিখেছেন, সবই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে শুধু একটি ওষুধ পেয়েছি।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. লাইলা শামীমা শারমিন বলেন, ‘প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে শতাধিক রোগী আসছেন, যার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্রদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে, কারণ তারা গাদাগাদি করে একসাথে থাকে এবং অনেক সময় পোশাক বা বিছানার চাদর শেয়ার করেন। গরম ও বর্ষার সময় এই রোগ বেশি বিস্তার লাভ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে শুধু একটি চুলকানির ট্যাবলেট রয়েছে। কিন্তু স্ক্যাবিস পুরোপুরি সারাতে লোশন, ক্রিম, অ্যান্টিসেপটিক শ্যাম্পু ইত্যাদির প্রয়োজন হয়, যার কোনোটিই হাসপাতালে সরবরাহ নেই। তাছাড়া শুধু একজন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিলেই হবে না, বরং তার পুরো পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা নিতে হবে, তা না হলে সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ওয়াহিদ মাহমুদ রবিন জানান, ‘বর্তমানে হাসপাতালে স্ক্যাবিস রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এটি একটি সংক্রামক চর্মরোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলেই এটি ছড়ায়। আমরা প্রতিদিন গড়ে শতাধিক স্ক্যাবিস রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছি। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওষুধের সরবরাহ কম হওয়ায় সব রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তি যেন আলাদা বিছানা, কাপড় এবং তোয়ালে ব্যবহার করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুরা সচেতনভাবে এই নিয়মগুলো মানতে পারে না বলেই তাদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছি।’
