৬ কোটি টাকা চুক্তিতে ২০০ কোটি টাকার গাইড বিক্রির টার্গেট!

ঝিনাইদহে অবৈধ গাইড কোম্পানির উপঢৌকন নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের বিদ্যা বাণিজ্য

আপলোড তারিখঃ 2025-09-23 ইং
৬ কোটি টাকা চুক্তিতে ২০০ কোটি টাকার গাইড বিক্রির টার্গেট! ছবির ক্যাপশন:

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের কাছে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বহু আগেই এসব বইয়ের ব্যবহার বন্ধ ঘোষণা করলেও প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভাবে ঝিনাইদহের বিভিন্ন বইয়ের দোকান, ফুটপাতের হকার এমনকি অনলাইন মার্কেটপ্লেসেও পাওয়া যাচ্ছে লেকচার, ব্যতিক্রম, পাঞ্জেরী ও অ্যাডভান্সের নিষিদ্ধ গাইড বই।


তথ্য নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের মাথা গুনে নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানির কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন ঝিনাইদহের স্কুল-কলেজের প্রধানেরা। শিক্ষার্থী প্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানির কাছ থেকে চুক্তি করা হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের লেকচার, ব্যতিক্রম, পাঞ্জেরী ও অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে হচ্ছে।


অভিভাবকরা বলছেন, এসব গাইড বই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তাশক্তি ও লেখার দক্ষতা নষ্ট করছে। অনেক ভালো শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের এসব বই পড়তে নিরুৎসাহিত করছেন। তবে পরীক্ষার ফল ভালো করার লোভ দেখিয়ে নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানির কাছ থেকে টাকা নিয়ে স্কুল-কলেজের কতিপয় শিক্ষক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে চাপ দিচ্ছেন বলে একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন।


অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলার ৬টি উপজেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সরকার নিষিদ্ধ করা গাইড বা নোট বই। স্কুল-কলেজের প্রধানদের সরাসরি যোগসাজশে ঝিনাইদহের আনাচে কানাচে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের বাজার এখন রমরমা। ফলে লেকচার, ব্যতিক্রম, পাঞ্জেরী ও অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের অবৈধ গাইড বইয়ের মজুদ গড়ে উঠেছে ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর এলাকার উদয়ন লাইব্রেরি, পাগলাকানই ব্যতিক্রম ভবন ও উপশহর পাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে।
উদয়ন লাইব্রেরির মালিক রাকিবুল ইসলাম রণি একাই ১২টি নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ২০২৬ সালে শতাধিক কোচিং সেন্টারের কাছে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার নিষিদ্ধ গাইড বই বিক্রি করার চুক্তি করেছেন বলে অভেযোগ। এছাড়া লেকচার পাবলিকেশনের মঞ্জুরুল ইসলাম, সম্রাট কুমার, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনের আলী হোসেন, সাদিক হোসেন ও অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের মিজানুর রহমান গাইড বিক্রির বিশেষ মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক চুক্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহ শহরের কাঞ্চননগর স্কুল অ্যান্ড কলেজ লেকচার কোম্পানির প্রতিনিধি মঞ্জুরুল ইসলামের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে কয়েকশ শিক্ষার্থীকে গাইড কিনতে চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ।


এছাড়া ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান বালিকা বিদ্যালয় ২ লাখ, শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৭০ হাজার, জামিলা খাতুন বালিকা বিদ্যালয় ৯০ হাজার, হাট গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩ লাখ ৭০ হাজার, গোয়ালপাড়া মোশারফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯০ হাজার, আল-হেরা ইসলামিক ইনস্টিটিউট ১ লাখ ৩০ হাজার, শিকদার মতলবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯০ হাজার, উত্তর নারানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২ লাখ ৫০ হাজার, হলিধানী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ৩০ হাজার, চোরকোল মাধ্যমিক বিদ্যালয় এক লাখ ৬০ হাজার, বাজার গোপালপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১ লাখ ৬০ হাজার, কে এম এইচ জিয়ানগর ১ লাখ ৪০ হাজার, বিষয়খালী মোস্তফা কামাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ২ লাখ টাকা, এম কে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ৪০ হাজার, সুরাট বারেক আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯০ হাজার, আনোয়ার জাহিদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৮০ হাজার, ফজের আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১ লাখ ৭০ হাজার, ঝিনাইদহ পৌর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১ লাখ ৩০ হাজার ও হরিশংকরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ৪২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডোনেশন নিয়ে ২০২৬ সালে নিষিদ্ধ গাইড বই চালানোর চুক্তি করেছেন বলে অভিযোগ।


এদিকে, কালীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন সারা উপজেলায় নিষিদ্ধ গাইড বই চালানোর জন্য লেকচার গাইড কোম্পানির কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। কামরুজ্জামান ও হুসাইন নামে দুই অভিভাবক অভিযোগ করেন, বই না কিনলে ছেলে-মেয়েকে ক্লাসেই ঢুকতে দেওয়া হয় না। অভিভাবকরা বলছেন, দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এ ধরনের চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়। অভিভাবক কামরুজ্জামান জানান, তার ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তার জন্য নিষিদ্ধ গাইড ও টেস্ট পেপার কিনতে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।


বিক্রয় নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের অবাধ বিক্রির বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান বলেন, এই বই বিক্রি করা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধ বাণিজ্য। এই গাইড বিক্রি বন্ধে প্রশাসনিক অভিযান চালানো যেতে পারে। তিনি কারা কারা এই নিষিদ্ধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত তাদের তালিকা চান সাংবাদিকদের কাছে।


এ ব্যাপারে শিক্ষা ও আইসিটির দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ.বি.এম. খালিদ হোসেন সিদ্দিকীবলেন, তথ্য-প্রমাণ পেলে আমরা কাউকে ছাড় দেব না। তিনি এ বিষয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ জানিয়ে বলেন, নিষিদ্ধ গাইড বই শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননশীলতা বিকাশে অন্তরায়। ফলে ঝিনাইদহ জেলায় এই নিষিদ্ধ গাইড বই যাতে না চলে সে বিষয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)