ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘জেলা প্রশাসন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রাণবন্তভাবে সবকিছুর আলোচনা করা যায়। দাপ্তরিক দুর্বলতাও আমরা খোলাখুলি তুলে ধরতে পারি। এটি জেলার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনার সর্বোচ্চ ফোরাম।’ তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, চুয়াডাঙ্গাবাসীর সহযোগিতায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে।
এছাড়া চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে চিকিৎসা বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ অতিরিক্ত অর্থ নেয়, তবে সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে হবে। প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’ একই সঙ্গে তিনি শহরের যানজট নিরসনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
গতকাল রোববার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভার কার্যক্রম শুরু হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নয়ন কুমার রাজবংশী। আগস্ট মাসের কার্যবিবরণী পাঠ করেন সহকারী কমিশনার সামিউল আজম।
কার্যবিবরণীতে জানানো হয়, আগস্ট মাসে মোট ১১৩টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যা জুলাই মাসের ১০৬টির তুলনায় বেড়েছে। অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাকাতি ১টি, চাঁদাবাজি ১টি, হত্যা ১টি, অপমৃত্যু ২৩টি, ধর্ষণ ৪টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৪টি, চুরি ১৩টি, বিস্ফোরক বা অস্ত্র আইনে ২টি, মানবপাচার ৩টি এবং অন্যান্য অপরাধ ৬১টি। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, গুরুতর অপরাধ যেমন ধর্ষণ, অপহরণ, গুম, হত্যা ও নিখোঁজ যাতে না বাড়ে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে এবং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া আগস্ট মাসে গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতিও সভায় তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, উপজেলা প্রশাসন দুটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর যৌতুক, বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানি রোধে ১৪টি সচেতনতামূলক সভা করেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর তিনটি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৫টি মামলায় ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ৪৬টি অভিযানে ১২৩টি মামলায় ৪২ হাজার ৭২০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিআরটিএ ১৮টি অভিযানে ৬৯টি মামলায় ২৫ হাজার ৬২০ টাকা জরিমানা করেছে। পুলিশ বিভাগ ১৫০টি মামলায় ৫ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে।
মুক্ত আলোচনায় পাবলিক প্রসিকিউটর মারুফ সরোয়ার বাবু বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গায় আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কিছু ঘটনা আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাই এসব ঘটনার সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া দেশীয় অস্ত্র নথিভুক্ত না করায় আসামিরা দ্রুত জামিন পাচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত ও নথিভুক্তির ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বদা সক্রিয়। দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে। অপমৃত্যুর ঘটনায় হত্যা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সরেজমিনে তদন্ত করা হবে। তবে সীমিত জনবল দিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণ কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে তিনি সবার সহযোগিতা চান।
সভায় জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সুধীজনরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ জনসাধারণের সুবিধা-অসুবিধার নানা প্রস্তাবনা ও সমালোচনা উঠে আসে। সিভিল সার্জন হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করেন। প্রেসক্লাব সভাপতি রাজীব হাসান কচি ও সাধারণ সম্পাদক বিপুল আশরাফ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে আরও সক্রিয় করার আহ্বান জানান।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন চেম্বার অব কমার্স সভাপতি ইয়াকুব হোসেন মালিক, জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম, জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম. সাইফুল্লাহ, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মেহেদী ইসলাম, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র, জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-আমিন, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সিদ্দিকা সোহেলী রশীদ, জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মণ্ডল, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার অহীন্দ্র কুমার মণ্ডলসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান ও জনপ্রতিনিধিরা।
দীর্ঘ আলোচনার পর সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অপরাধ প্রবণতা হ্রাস, সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সভায় গৃহীত প্রস্তাবগুলো জেলা পর্যায়ে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে। জেলা প্রশাসকের প্রাণবন্ত নেতৃত্ব এবং উপস্থিত সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ চুয়াডাঙ্গার আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে নতুন গতি দিয়েছে।
