আজ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। এতে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ঢাবি প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৭৪। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৯১৫ জন এবং ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯৫৯ জন। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন ৪৭১ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী ৬২ এবং পুরুষ প্রার্থী ৪০৯ জন। প্রতিটি ভোটার ডাকসুতে ২৮টি এবং নিজ নিজ হল সংসদে ১৩টি পদে ভোট দেবেন। অর্থাৎ একজন ভোটার ৪১টি ভোট প্রদান করবেন।
ঢাবি প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, সকাল থেকে নিয়মিতভাবে ভোটগ্রহণ চললে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ভোট শেষ করা সম্ভব হবে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বাগছাস, বামজোট, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রার্থীরা। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যাও শতাধিক। প্রার্থীদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি বেড়েছে। তাদের সংখ্যা ৬২ জন, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। ঢাবি প্রশাসন জানিয়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ডাকসুর রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
সার্বিক প্রস্তুতির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চাই শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন। প্রতিটি ভোট আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পর্যবেক্ষক প্যানেল, প্রযুক্তিসব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্পষ্ট আনন্দ ও উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে।’ এ বিষয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী পারভেজ ইসলাম বলেন, প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচনের কথা থাকলেও চতুর্থ বর্ষে এসে প্রথমবারের মতো এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছি, যা আমাদের জন্য সত্যিই আনন্দের বিষয়। আমরা আশা করছি, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বিঘ্নভাবে ভোট দিতে পারব। প্রার্থীদের পরমতসহিষ্ণু প্রচার ও আত্মসংযম এরই মধ্যে একটি সুন্দর ভোটের পরিবেশের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ভোট সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে শিক্ষকদের দিয়ে একটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক প্যানেল গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেনাবাহিনী মোতায়নের কথা বললেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজেদের ভেরিফায়েড পেজে এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, জানিয়েছে ডাকসু নির্বাচনে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিশেষত ডাকসু নির্বাচনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রশ্নই ওঠে না। সব মিলিয়ে এবারের ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের জন্য গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এ নির্বাচন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নয়, বরং গোটা দেশের দৃষ্টি কাড়ছে। এটি অবাধ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন সবাই।
আটটি নির্ধারিত ভোটকেন্দ্র, বুথ ৮১০টি:
ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আটটি কেন্দ্রে, যেখানে প্রতিটি কেন্দ্রে একাধিক হলের শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন। কার্জন হলে ভোট দেবেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, অমর একুশে হল ও ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থীরা। শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে ভোট দেবেন জগন্নাথ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীরা। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) কেন্দ্র নির্ধারিত রোকেয়া হলের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে ভোট দেবেন বাংলাদেশ-কুয়েত মেত্রী হল ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শিক্ষার্থীরা। সিনেট ভবনে ভোট দেবেন স্যার এ এফ রহমান হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীরা। উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দেবেন সূর্যসেন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও কবি জসীম উদ্দীন হলের শিক্ষার্থীরা। ভূতত্ত্ব বিভাগ নির্ধারিত হয়েছে কবি সুফিয়া কামাল হলের জন্য এবং ইউল্যাব স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দেবেন শামসুন নাহার হলের শিক্ষার্থীরা। এবারের নির্বাচনে বুথের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮১০টি; প্রাথমিকভাবে বুথের সংখ্যা ছিল ৫০০, পরে বাড়িয়ে ৭১০ করা হয় এবং সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা দাঁড়ায় ৮১০-এ।
ঢাবি এলাকায় প্রবেশাধিকার সীমিত:
ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন। গতকাল সোমবার রাত ৮টা থেকে আগামীকাল বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রবেশপথ সাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে। ফলে শাহবাগ, পলাশী, দোয়েল চতুর, শিববাড়ী ক্রসিং, ফুলার রোড, উদয়ন স্কুল ও নীলক্ষেত গেট দিয়ে কেউ প্রবেশ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ আইডি কার্ডধারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রবেশ করতে পারবেন, আর তাদের পরিবারের সদস্যরা পরিচয়পত্রের কপি দেখিয়ে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত বা জরুরি সেবার গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবে না। পাশাপাশি ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বৈধ লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ভঙ্গ করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ভুয়া ভোটার রুখতে ব্যবস্থা:
নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শঙ্কা ছিল ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার। নীলক্ষেতের কিছু কম্পিউটার দোকানে ভুয়া কার্ড তৈরির অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পাসেও এ ধরনের কার্ডসহ শিক্ষার্থী আটক হওয়ার নজির আছে। তবে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। প্রধান রিটার্নিং অফিসার জানান, প্রতিটি ভোটারের ক্ষেত্রে তিন ধরনের চেকিং করা হবে। ফলে ভুয়া কার্ড ব্যবহার করে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। শুধু বৈধ ও নিয়মিত শিক্ষার্থীরাই ভোট দিতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশদ্বার ও ভোটকেন্দ্রে ভুয়া ভোটার শনাক্তকরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয়পত্র কিউআর স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে ‘ভেরিফাইড ডাকসু ভোটার কনফারমেশন’ মেসেজ প্রদর্শন করবে। ভোটার কোড নম্বর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভারে ভোটার যাচাই করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভার থেকে এ মেসেজ প্রদর্শন করবে বিধায় কোনো ভুয়া পরিচয়পত্র এ মেসেজ প্রদর্শন করতে পারবে না।
ভোটের দিন ক্যাম্পাস ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা ভোটের দিন ক্যাম্পাস ও ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঢাবি প্রশাসন বেশকিছু কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে। নির্বাচনের দিনে কোনো ভোটার, প্রার্থী কিংবা সমর্থক মোবাইল ফোন, ব্যাগ, স্মার্ট ওয়াচ, ল্যাপটপসহ যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস, পানির বোতল বা তরলজাতীয় দ্রব্য নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। এতে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য অনিয়ম ঠেকানোই মূল লক্ষ্য। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আচরণবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে ভোটের পরিবেশ কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। একইসঙ্গে নির্বাচন ঘিরে অনলাইনে সাইবার বুলিং, অপপ্রচার বা ভুয়া তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে নজরদারি চালানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বা গুজব ছড়ানো রোধে একটি সাইবার নিয়ন্ত্রণ সেল কাজ করছে এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রশাসনের লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারবেন এবং কোনো ধরনের ভীতি বা হয়রানির মুখে পড়বেন না। ভোটারদের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে আজ ক্যাম্পাসে বিশেষ শাটল সার্ভিস চালু থাকবে। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত নির্দিষ্ট রুটে বাস চলবে। যাতে ভোটাররা খুব সহজে স্বল্পসময়ে ভোটকেন্দ্র পৌঁছাতে পারেন। রুটম্যাপ অনুযায়ী, ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে শুরু হয়ে কার্জন হল, শাহবাগ, টিএসসি, উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, শিক্ষক ক্লাব, ইউল্যাব স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিনেট ভবন, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে আবার ভূতত্ত্ব বিভাগে ফিরবে বাস। এছাড়া নিয়মিত শিডিউলের বাইরে অতিরিক্ত বাসও থাকবে।
প্রার্থীদের ফেসবুকে সাইবার হামলার অভিযোগ তবে নির্বাচনের আগের দিন (সোমবার) প্রার্থীদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একের পর এক সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, জিএস প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিমসহ কয়েকজনের আইডি সাময়িকভাবে ডিজেবল হয়েছে। শিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েমের ফেসবুক অ্যাকাউন্টও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে তৎক্ষণাৎ সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ফেসবুক আইডি দিয়ে আমরা নির্বাচনের প্রচার চালাচ্ছিলাম। তা প্রচুর মানুষের কাছেও পৌঁছাচ্ছিল। রাজনৈতিকভাবে আমাদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে একটি এ সাইবার অ্যাটাক চালিয়েছে।
