ছবির ক্যাপশন:
সোহেল রানা ডালিম, চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গা শহর ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে ধুলো ও ময়লার নগরীতে। সড়ক, ফুটপাত, ড্রেন- যেখানেই চোখ যায়, সেখানেই ছড়িয়ে আছে নোংরা-আবর্জনা। নাগরিক অসচেতনতা ও পৌরসভার অব্যবস্থাপনা মিলেই এ শহরের পরিবেশকে প্রতিনিয়ত করে তুলছে বসবাসের অনুপযোগী। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির ময়লা সড়কে ফেলা হচ্ছে। শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোর ধারে প্রতিদিনই দেখা যায় ময়লার স্তূপ। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাতের বেলা দোকানের ময়লা সড়কের ওপর ফেলে যায়। শুধু তাই নয়, এক শ্রেণির মানুষ বাসাবাড়ির ময়লাও সরাসরি রাস্তায় বা ড্রেনে ফেলছে। ফলে ময়লা গিয়ে জমছে ড্রেনে, আর সেই সঙ্গে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে বর্ষা মৌসুমে ড্রেন উপচে পানি জমে তৈরি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। আর শুকনো মৌসুমে ধুলো ও দুর্গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় শহরবাসীর।
চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী আছাদুজ্জামান বলেন, ‘শহরের পলাশপাড়ায় আমি বসবাস করি, আর আমার অফিস একাডেমি মোড়ে। বাড়ি থেকে বের হতেই ভাঙা ড্রেন, রাস্তার পাশে যেখানে সেখানে ময়লার স্তূপ পড়ে। প্রতিদিন নাক চেপে স্তূপ বাড়ি থেকে বের হতে হয়। আবার অফিসে যেতে গিয়ে আরও বিপাকে পড়তে হয়। কারণ একাডেমি মোড়ে পৌঁছানোর আগেই সারাগায়ে ধুলো জমে যায়। এছাড়া ভাঙা রাস্তা শহরে চলাফেরা এখন একেবারেই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সাইমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শহরের বাইরে আমার বাড়ি, শহরে কলেজে আসতে ভালো লাগে না। রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ চোখে পড়ে। সবখানেই ময়লা আর দুর্গন্ধ, এর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। ধুলার কারণে স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।’ ওই কলেজছাত্রী আরও অভিযোগ, এমনিতেই ফুটপাত দখল হয়ে গিয়েছে। তার ওপর সড়কে ময়লা ধুলোবালির চাপে নাজেহাল অবস্থা।
কথা হয় শহরের একজন সাধারণ পথচারী আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শহরে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন নেই বললেই চলে। ফলে সাধারণ মানুষ বাসাবাড়ির ময়লা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ময়লা রাস্তায় বা ড্রেনে ফেলে দিয়ে শহরকে নোংরা করছে।’ এ অবস্থার জন্যে পৌরসভার কর্মকর্তাদের দুষলেন তিনি। আরও বলেন, ‘সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা যদি এক মাস গাড়িবিহীন সাধারণ মানুষের মতো চলাচল করেন, তখনই তারা প্রকৃত সমস্যা বুঝতে পারবেন। এবং তখনই এসকল সমস্যার সমাধান হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক, চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটির সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা, অন্যদিকে নাগরিক অসচেতনতা এই দুই মিলেই প্রতিদিনের জীবনযাত্রা হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। এভাবে চলতে থাকলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। এর সঙ্গে সঙ্গে মশাবাহিত রোগ, ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়বে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এসকল সমস্যার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চুয়াডাঙ্গা শহর পরিণত হবে এক অস্বাস্থ্যকর আবাসভূমিতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান পৌর প্রশাসক শারমিন আক্তার শহর পরিষ্কারে বিশেষ উদ্যোগ নিলেও সেই ধারাবাহিকতা বর্তমানে আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌর প্রশাসক শারমিন আক্তার বলেন, ‘শহরের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আমরা কিছু বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। যার মধ্যে মশক নিধনসহ কয়েকটি কর্মসূচি অব্যহত রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অসচেতনতা একসঙ্গে এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। আমরা ইতিমধ্যে শহরের প্রধান সড়ক ও ব্যস্ততম এলাকাগুলোর ডাস্টবিন ব্যবস্থাপনা, নিয়মিতভাবে সড়ক ও ড্রেন পরিষ্কারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে শুধু পৌরসভার একার পক্ষে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, নাগরিকরা যদি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলেন, ড্রেনে বর্জ্য না দেয় এবং ফুটপাত দখল না করেন, তবে শহর অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। আমরা শিগগিরই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করব। শহরকে ধুলো ও ময়লামুক্ত রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। আমি মনে করি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই তা সম্ভব হবে।’
তবে সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা বাধ্যতামূলক করতে হবে, একইসঙ্গে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তা না হলে এ সংকট আরও ভয়াবহ হবে।
