ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গায় জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জহিরুল ইসলাম। সভার শুরুতেই জুন-২০২৫ মাসের কার্যবিবরণী পাঠ করেন সহকারী কমিশনার আশফাকুর রহমান।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়, জেলা পরিষদ কর্তৃক ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এডিবি খাতে বরাদ্দকৃত ৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার মধ্যে ৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ১৮৮টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান আছে। জেলা খাদ্য বিভাগ কর্তৃক ১২ হাজার ৭৫৩ মেট্রিক টন চাল মজুদ আছে। শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরামতের জন্য ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ মোট ৩৯টি সরকারি দপ্তরের কর্মকান্ডের ওপর আলোচনা করা হয় এবং বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এসময় বক্তব্য দেনবন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার রকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ভৈরব নদী ও নবগঙ্গা নদীর দুই পাড়ে মোট ২৫ কিলোমিটার জায়গায় ২৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে নবগঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কিছু চারা নষ্ট হয়েছে। গাছ লাগানোর প্রথম দুই বছর পর ১০% গাছের চারা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে আমরা লোকবল দিয়ে এ গাছগুলো পরিচর্যা করি।’ বিআরটিএ পরিদর্শক নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার কর্তৃক নির্দেশিত সরকারি/বেসরকারি ২০ বছরের অধিক ব্যবহৃত বাস ও ২৫ বছরের অধিক ব্যবহৃত ট্রাক এখন থেকে সড়কে চলাচল করতে পারবে না। এটি আজ থেকেই কার্যকর হবে। প্রাইভেটকার এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। এ নির্দেশ অমান্য করলে সরকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
জেলা সঞ্চয় অফিসার নজরুল ইসলাম বলেন, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের সঞ্চয়ী টার্গেটের ৮৭ কোটি টাকার মধ্যে ৫৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যা মোট টার্গেটের ৬১. ১৪ শতাংশ। এখন থেকে প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর সঞ্চয়পত্রের মূল্যহার নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। জেলা রেজিস্টার লোকমান হোসেন বলেন, জুন মাসে ৭ কোটি ২৮ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ২ হাজার ৭৭৯ খানা দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৩০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
সভায় জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকা ও ডেইলি মর্নিং গ্লোরি পত্রিকার চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রতিনিধি এবং দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক মেহেরাব্বিন সানভী বলেন, ‘দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২৬৪ ঘর নির্মাণে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ হয়েছে স্থানীয় ও জাতীয় পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনে। বর্ষায় ঘরগুলো দিয়ে পানি পড়ছে। তাদের বাস করায় মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে এখনো প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এছাড়া আমাদের চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ওপর চুয়াডাঙ্গার ৯৯ শতাংশের ওপর মানুষ নির্ভর। তবে অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার না থাকায় অপারেশন বন্ধ। আজকের রেজুলেশনে শুনলাম, যোগাযোগ অব্যহত রয়েছে। কিন্তু ফল পাচ্ছি না। এদিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। এবং এই মৌসুমে মাথাভাঙ্গা নদীতে প্রচুর কোমর দেয়া হচ্ছে। কোমর সরানোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এসময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে আশ্রয়ণের বিষয়ে তদন্ত করে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। জেলা মৎস্য অফিসারকে কোমর অপসারণ এবং হাসপাতাল নিয়ে সিভিল সার্জন ও তত্ত্বাবধায়ককে জানানোর নির্দেশ দেন। সভায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি রাজীব হাসান কচি গত সভায় উল্লেখিত সকল কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, পৌরসভার উদ্যোগে বেওয়ারিশ গরুর আনাগোনা কমানো গেলেও রাস্তায় কুকুরের উপদ্রব খুব বেড়েছে। কুকুর রাতে খুবই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এর দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।
এসময় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিপুল আশরাফ বলেন, চুয়াডাঙ্গা রেলগেটের নিচের আন্ডারপাসটি পানি জমে যানবাহন চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সামনে পানি নিষ্কাশনের ড্রেনের ঢাকনাটি ভেঙে যাওয়ায় পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। এটি মেরামত করানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সমন্বয় কমিটির সভায় সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিয়া কনসালটেন্ট নিয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষেই কোনো অগ্রগতি করতে পারিনি। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বলেছি, এখানে একটি মেডিকেল অফিসারের পোস্ট খালি আছে, সেখানে অন্তত একজন অ্যানেস্থেসিয়া কনসালটেন্ট না হলেও একজন প্রশিক্ষিত মেডিকেল অফিসার দিলেও আমরা ইমার্জেন্সি ম্যানেজ করতে পারি। আর সামনে আমাদের একটি ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন হবে টাইফয়েড ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন। এখানে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টাইফয়েড ভ্যাকসিনের একটি ডোজ দেয়া হবে। মোট ৩ লাখ ১০ হাজার জনকে এ ভ্যাকসিন দেয়া হবে। আমাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আগামী ২১ তারিখ থেকে শুরু হবে এবং পরবর্তীতে ১ সেপ্টেম্বর আমরা এই প্রোগ্রামটা সারা দেশব্যাপী একসাথে পালিত হবে। এছাড়া ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক আছে। একটি ভালো সংবাদ হচ্ছে শুধু ডাক্তারদের ৪৮তম বিসিএস’র প্রিলিমিনারি শেষ হয়েছে। হয়ত আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই উপজেলা পর্যায়ের মেডিকেল অফিসার পেয়ে যাব বলে আমরা আশাবাদী।’
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সংস্কারের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চুয়াডাঙ্গায় কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। যেমন তিল, মুগডাল, সবজি, হলুদ ও পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। চুয়াডাঙ্গায় জুলাই শহিদদের স্মৃতিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হচ্ছে। অবকাঠামোর কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। মূল স্তম্ভ ঢাকা থেকে পাঠিয়ে দেবে। তারপরে আমরা সাথে সাথে এটি ইনস্টল করে ফেলব। আগামী ৫ তারিখের মধ্যেই স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে সকলেই ৫ তারিখে শ্রদ্ধা নিবেদন করব। তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় মতো তদারকি ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে, তবেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
এছাড়াও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমান, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মহাসীন আলী, জেলা মৎস্য অফিসার আবুল কালাম আজাদ, সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সুজাত আলী, ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব, ছাত্রনেতা সজিবুর রহমান, সাংবাদিক মেহেরাবিন সানভি প্রমুখ।
সভায় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম. সাইফুল্লাহ, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিথি মিত্র, জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল-আমীন, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ মেহেদী ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ হোসেন, কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা হাসান আলী, ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা জামিল হোসেন, পাসপোর্টের উপ-সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন, আনসার কমান্ডার ফারুক হোসেন, জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মন্ডল, জেলা শিক্ষা অফিসার দিল আরা চৌধুরী প্রমুখ।
