ট্যাক্সের টাকা চেয়ারম্যানের পকেটে, ভাতার টাকাও লুট!

নানা অনিয়মের মধ্যে চলছে আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম

আপলোড তারিখঃ 2025-07-08 ইং
ট্যাক্সের টাকা চেয়ারম্যানের পকেটে, ভাতার টাকাও লুট! ছবির ক্যাপশন:

 ১৫শ টাকা ট্যাক্স নিয়ে ১০ টাকার রশিদ দেয়ার অভিযোগ
* মাতৃত্বকালীন ভাতার নামে দুই নারীর পরিচয় বিকৃতি ও বিকাশ নম্বর জালিয়াতি
* ইউপি চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত ভাতার কাগজে স্বামীর পরিচয় গড়মিল
* চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সব খাতে অনিয়মের অভিযোগ ইউপি সদস্যদের
* চেয়ারম্যান দায় চাপাচ্ছেন সচিব ও গ্রাম পুলিশের ওপর


নানা অনিয়মের মধ্যে চলছে জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। নিজ হাতে ট্যাক্স নিয়ে টাকার সমপরিমাণ রশিদ না দিয়ে ট্যাক্সের টাকা পকেটে ভরার অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান মির্জা হাকিবুর রহমান লিটনের বিরুদ্ধে। মাতৃত্বকালীন ভাতায় স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় ওলোট-পালোট করে ভুল বিকাশ নম্বর দিয়ে টাকা তুলে নেয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অতিদ্রুতই তদন্ত করে এই আওয়ামী লীগের দুর্ধর্ষ ক্যাডার খ্যাত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।


জানা গেছে, কয়েকদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদে ট্যাক্স পরিশোধ করতে যান নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মনসুর আলী। তার অভিযোগ, ১৫শ টাকা জমা নিয়েছেন খোদ চেয়ারম্যান মির্জা হাকিবুর রহমান লিটন। তবে চেয়ারম্যান তাকে দিয়েছেন মাত্র ১০ টাকার একটি রশিদ। মনসুর আলী বলেন, ‘১৫শ টাকা দিয়ে ১০ টাকার রশিদ দিয়েছেন চেয়ারম্যান নিজে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাকি টাকার রশিদ কই? চেয়ারম্যান বলল, পূর্বের বাকি ছিল, কেটে নেয়া হয়েছে। আমি বলেছিলাম, তাও তো রশিদ পাবো। কিন্তু তিনি বলেন ওতেই হবে। খাতায় তুলেছি।’


অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। খোদ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরাই এই দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে করছেন অভিযোগের পাহাড়। মাতৃত্বকালীন ভাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভাতাভোগীদের তথ্যে চেয়ারম্যান নিজে করেছেন গড়মিল। অনুসন্ধানে দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকার হাতে এসেছে বিবাহের আজব দুটি কম্বিনেশন। দুজন নারীর নামে নেয়া মাতৃত্বকালীন ভাতার কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে সুপারিশ করা দুটি ভাতার কাগজেই একজনের স্ত্রীকে আরেকজনের স্ত্রী বানিয়ে অন্য একটি বিকাশ নম্বর ব্যবহার করে তুলে নেয়া হচ্ছে টাকা। 
দুটি ভাতার কাগজ ঘেঁটে দেখা যায়, ঘুঘরগাছি গ্রামের আসমা খাতুনের নামে একটি মাতৃত্বকালীন ভাতা উঠেছে। তিনি বলছেন, তিনি আবেদনই করেননি। অথচ, আবেদনে তার নাম, পরিচয়, এনআইডি কার্ড ও এনআইডি নম্বর এমনকি ছবিও আসমা খাতুনের। তবে এই কাগজগুলোর সাথে দেয়া স্বামীর পরিচয় সঠিক নয়। আসমা খাতুন বলেন, ‘আপনারা বলছেন বলে জানলাম, আমার নামে ভাতা উঠছে। অথচ আমি আবেদনই করিনি। আমার ছবিই তো দেখছি। তবে আমার স্বামীর পরিচয় সঠিক না। বিকাশ নম্বরটি কার সেটাও জানি না।’


আরেকজন ভাতাভোগী শাহাপুর গ্রামের কমলা বেগম। তার নামেও ভাতা উঠছে। তবে তিনি জানেন না। তারও স্বামীর নাম দেয়া হয়েছে ভুল, বিকাশ নম্বরও ভুল। তবে এনআইডি ও ছবি কমলা বেগমের। তিনি বলেন, ‘কে বা কারা এই ভাতার টাকা নিচ্ছে, তা জানি না। তবে আমি এটার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করছি।’


এসব বিষয়ে জীবননগর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তাজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওই দুটি ভাতার কাগজপত্র পুনরায় দেখে বলেন, ‘এ সমস্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন পাঠিয়েছে। এই দুজনেরই নাম আছে। গত মে মাসে নাম দেয়া হয়েছে। জুন মাসে অনুমোদন হয়েছে। সম্ভবত এক মাসের টাকা ঢুকেছে। আপনি তথ্য দিলেন। নিশ্চয় এটা আমরা যাচাই করে ব্যবস্থা নেব। এবং বাকিগুলোও যাচাই করা হবে।’


তবে ভাতার কাগজে দেয়া বিকাশ নম্বর দুটিতে কল দেয়া হলে বন্ধ পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের একজন সদস্য বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে দেখেন কোন খাতে অনিয়ম নেই। একজনের স্ত্রীকে আরেকজনের স্ত্রী বানাচ্ছেন। কাগজ-কলমে এই লোকটা ইউনিয়ন পরিষদকে ধ্বংস করে ফেলছেন। তার অনিয়ম ও দুর্নীতি আগের মতোই রয়েছে। আগে আওয়ামী লীগের এমপি টগরের ভয় দেখিয়ে করতে, এখন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল-আমীনের ভয় দেখান। ইউএনও কে বলে কি লাভ, সে তো নিজেই এসবের সাথে জড়িত।’


এদিকে, ১৫শ টাকা নিয়ে ১০ টাকার রশিদ দেয়ার এ ঘটনার একটি ভিডিও বক্তব্য দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর ফেসবুক পেজে প্রকাশ পেলে নড়েচড়ে বসেন চেয়ারম্যান। হঠাৎ করেই সমস্ত দোষ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ রকিবুল ইসলামের ওপর চাপিয়ে তাকে করা হয়েছে শোকজ। তবে চেয়ারম্যান আবার দোষারোপ করছেন ইউপি সচিব ও গ্রাম পুলিশ উভয়কে। ইউপি সচিব ও গ্রাম পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে।


এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মির্জা হাকিবুর রহমান লিটন বলেন, ‘ভাতার কাজ উদ্যোক্তা করে। ৫ তারিখের পরে আমরা কোনো জাল কাগজ দিই না। আপনি যে দুইটা বলছেন, তা আমরা পেয়েছি। আমরা লিখিতভাবে দেবো, যার প্রাপ্য তাকে দেয়া হয়। আমরা তো কোনো বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিই না, কে প্রেগনেন্ট কে প্রেগনেন্ট নয়। এগুলো দেয়া হয় মানে ওই মেম্বারে সুপারিশ করে, ওমুক নেতা সুপারিশ করে। আমাদের এখানে দেয়, আমরা পাঠিয়ে দিই। এটার একটা চক্র আছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘টাকার বিষয়টা নিয়ে আমরা এখনি মিটিং করলাম। জামায়াত-বিএনপি উভয়ের নেতৃবৃন্দ ছিল। এটা নিয়েছে সচিব ও গ্রাম পুলিশ। আমরা তাদের ডেকে সাসপেন্ড করলাম।’ তবে পরে মুঠোফোনে কল দিয়ে পুনরায় ইউপি চেয়ারম্যান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা গ্রাম পুলিশকে শোকজ করেছি। সে স্বীকার করেছে টাকাটা সেই নিয়েছিলো।’


এ বিষয়ে জানতে ইউপি সচিব জাকির হোসেন বলেন, ‘আজকে অফিসে আসার পর গ্রাম পুলিশ রাকিবুল ইসলাম বলে টাকা তার কাছেই আছে। সে ভুল করে ফেলেছে। চেয়ারম্যান তাকে শোকজ করতে বলেছে, আমি শোকজ করেছি। আমাকে দিয়ে গ্রাম পুলিশকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ানো হলো। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ গ্রাম পুলিশ রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ভুল করে ফেলেছি। টাকা আমার কাছেই ছিল।’

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)