ছবির ক্যাপশন:
মাত্র চারটি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এখন খামারে রয়েছে ৬৫টি গরু, যার মধ্যে ৩০টি গাভি। পিতার বসতভিটায় দেড় বিঘা জমিতে শুরু করা সেই ছোট্ট উদ্যোগ এখন কোটি টাকার খামারে রূপ নিয়েছে। গালগল্প নয়, সংগ্রামী জীবনের সত্য গল্প। এই গল্প ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাগান্না ইউনিয়নের বাদপুকুরিয়া গ্রামের সফল নারী উদ্যোক্তা আম্বিয়া খাতুন লাকির কথা।
কোনো পুঁথিগত জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ২০১৭ সালে তিনি গরু পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ইউটিউব থেকে শেখা তথ্যই ছিল তার একমাত্র সহায়। শুরুতে দুটি শেডে চারটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু নিয়ে যাত্রা করেন। যার নাম দিয়েছেন ‘মায়ের দোয়া ডেইরি ফার্ম’। স্বামী অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান, আর ফেরেননি। তারপর বাবার বাড়ি ফিরে এসে মা-ভাইদের নিয়েই তার সংসার। কঠিন সময় পার করলেও হার মানেননি লাকি। দিনের পর দিন খামারে পরিশ্রম করে অজপাড়া গাঁয়ে গড়ে তুলেছেন সফল পশুপালন কেন্দ্র। কঠোর পরিশ্রম, সততা, ধৈর্য্যরে পর লাকির সংগ্রামী জীবনে সফলতা যেন সাফল্যের দুয়ারে প্রবেশ করেছে।
খামারে বর্তমানে চারটি শেডে উন্নতমানের দুধেল গাই ও ষাঁড়সহ মোট ৬৫টি গরু রয়েছে। প্রতিদিন গরুগুলোর খাবার ও চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। এখানে পাঁচজন স্থায়ী কর্মী এবং কয়েকজন দৈনিক হাজিরায় কাজ করেন। খামারের কর্মচারী আব্দুল আলিম বলেন, ‘লাকি আপার খামারে কাজ করে যে বেতন পাই, তাতে আমার সংসার এখন বেশ ভালোভাবেই চলছে। শুধু আমিই না এখানে এলাকার আরও ৯ জন কর্মচারী কাজ করে সবাই পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছি।’
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে লাকি খাতুন প্রস্তুত রেখেছেন ৩০টি গরু, যেগুলোর সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। খাদ্য তালিকায় রয়েছে বিচুলি, নেপিয়ার ঘাস, পাকচন, গম, ধানের কুড়া, গমের কুড়া ও ভুষি। লাকির ‘মায়ের দোয়া ডেইরি ফার্ম’-এর উৎপাদিত দুধ থেকে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন, দই, ছানা, ও উন্নতমানের ঘি। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে বিক্রি করেও পাচ্ছেন বাড়তি অর্থ।
এই সফল নারী উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২১-২২ অর্থবছরে গবাদিপশু খাতে আইকন হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে তিনি হয়েছেন পঞ্চম এবং খুলনা বিভাগে প্রথম। এছাড়াও পেয়েছেন একাধিকবার ‘জয়িতা’ পুরস্কারসহ বেসরকারি এনজিও সংস্থার উদ্যোক্তার বিশেষ সম্মাননা। বিশ্বব্যাংক তাকে উদ্যোক্তা হিসেবে ২৪ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। তিনি নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘গাভি গরু সমিতি’ নামের একটি নারী উদ্যোক্তা সংগঠন, যার সদস্য সংখ্যা ৪০ জন এবং বর্তমান মোট পুঁজি ১০ লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
আম্বিয়া খাতুন লাকি বলেন, ‘আমি ইউটিউব দেখে শিখে শুরু করেছিলাম। এখন অনেক নারী আমাকে দেখে গরু পালন শুরু করেছেন। আমি চাই তারা সবাই স্বাবলম্বী হোক।’ সহযোগিতার প্রশ্নে তিনি বলেন, তার খামারে নির্দিষ্ট ডাক্তার নিয়োজিত আছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর খোঁজখবর রাখেন। নিয়মিতভাবে দেখভাল করার পাশাপাশি বিভিন্ন সুপরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। নারীরা সমাজে পিছিয়ে থাকবে কেন? তারা উদ্যোগী হতে চাইলেই সমাজ বিনির্মাণে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আম্বিয়া খাতুন লাকী আরও বলেন, ‘আমার কাজে অনুপ্রেরণা পেয়ে আরও ৮ জন নারী নিজ তত্ত্বাবধানে খামার তৈরি করেছে। তারাও বেকারত্ব দূরীকরণে এলাকায় বড় ভূমিকা রাখছে।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল করিম বলেন, আম্বিয়া খাতুন লাকী ডেইরি খামারিদের আইকন। শুধু এই উপজেলা বা জেলা নয় বরং দেশব্যাপী একজন নারী হিসেবে অনুকরণীয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে আমরা তাকে আমন্ত্রণ করে থাকি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে যতটুকু করা যায়, ততটুকু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তার সফলতার জন্য পুরো ক্রেডিট তার নিজেরই। অনেকেই লাকির খামার দেখে খামার গড়েছেন। সফল উদ্যোক্তার পুরস্কারও পেয়েছেন।
