ছবির ক্যাপশন:
ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি রোধ : ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ
ভুয়া দলিলে ব্যাংক ঋণ গ্রহীতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা
সমীকরণ ডেস্ক: ভুয়া দলিলে ব্যাংক ঋণ গ্রহীতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা ও কুঋণকে অডিটের আওতায় আনাসহ সাত দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি রোধে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে লিখিতভাবে এ সুপারিশ করে দুদক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। দুদকের বাকি পাঁচ সুপারিশ হচ্ছে- ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ, ঋণ পুনঃতফসিলের আগে যৌক্তিক জামানত নিশ্চিত, ব্যাংকের ঝুঁকি শনাক্তে আগাম সমীক্ষা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে শনাক্তকৃত অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিচালনা পর্ষদকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা।
এ প্রসঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দুদকের দেয়া সুপারিশের কয়েকটি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। আলোচনার মাধ্যমে বাকিগুলোও বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলো নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ব্যাংকিং খাত সংক্রান্ত এক কর্মশালায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
একই অনুষ্ঠানে দুদকের সচিব শামসুল আরেফিন বলেছেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে কয়েকটি সুপারিশ করেছে দুদক। ঋণ ইস্যুু ও বিতরণ ব্যবস্থাকে অধিক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় মনিটিরং সেল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সেখান থেকে ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া, আদায় ও অনুমোদন মনিটরিং করা হবে। তিনি আরও বলেন, ঋণের অর্থ প্রকৃতভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে না। অনেক অর্থ পাচার হচ্ছে। এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, দুদকের সুপারিশগুলোর যৌক্তিকতা আছে। এটি বিবেচনাযোগ্য। তবে কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, তা সবার সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ভুয়া দলিল দিয়ে ঋণ নেয়ার অর্থ হচ্ছে এক ধরনের ক্রিমিনাল অপরাধ। ব্যাংক ঋণ পেতে এ ধরনের অপরাধের আশ্রয় নেয়ার ক্ষেত্রে দুদকের যে প্রস্তাব তা আমি সমর্থন করছি।
দুদকের সুপারিশে বলা হয়, ব্যাংকগুলোতে কুঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এ জন্য ‘বিশেষ অডিটের’ আওতায় কুঋণের সার্বিক চিত্র নিয়ে আসতে হবে। এছাড়া ঋণের বিপরীতে জামানতের বিষয়টি ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। তা যাচাই-বাছাই না করেই পুনঃতফসিল করা হয়। ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের আগে জামানত দ্বারা আবৃত্ত কিনা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
জানা গেছে, ব্যাংকের কতিপয় পরিচালনা পর্ষদের কারণে দুর্নীতি ও অনিয়ম বেশি মাত্রা বাড়ছে। বেসিক ব্যাংক হচ্ছে অন্যতম উদাহরণ। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত একাধিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রমকে।
এছাড়া আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করতে একটি সমীক্ষা পরিচালনার কথা বলেছে দুদক। এক্ষেত্রে সমীক্ষার মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকের ঝুঁকি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে হবে। পরে সে ফলাফল অনুযায়ী প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সুপারিশে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়লে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত এবং খেলাপি ঋণের বিস্তারিত বিবরণ জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতি, অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এক ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অধিকাংশ ব্যাংকের মূলধন হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের জুনের হিসাবে বেসিক ব্যাংকে ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকে ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৭১০ কোটি টাকা ও রূপালী ব্যাংকে ৭৪০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলোর অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও ক্ষেত্রবিশেষ দুর্নীতির এ মূলধন ঘাটতি হচ্ছে। আর তা পূরণে প্রতি বছর কোষাগার থেকে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে তা যৌক্তিক কিনা এ প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির প্রতীক হচ্ছে বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ। এর জন্য ৯০ শতাংশ দায়ী পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা। এখন ঋণ আদায়ে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) আরও বেশি নজর দিতে হবে এবং এতে আদায়ের হার ভালো হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের এমডিদের পারফরম্যান্স অডিটের আওতায় আনা দরকার। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখেশুনে দিতে হবে।
