ছবির ক্যাপশন:
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গার বাজারে ভোজ্য তেলসহ নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়েই চলছেন। এছাড়া একই বাজারে দামের তারতম্য দেখা গেছে। বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছেমতো ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দাম রাখছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। আর বিক্রেতারা বলছেন, দাম বাড়ার সাথে তাঁদের কোনো হাত নেই। তাঁরা বেশি দামে কিনছেন, বেশি দামে বিক্রি করছেন। তবে বর্তমানে বাজারে ক্রেতা কম বলেও জানাচ্ছেন এসব খুচরা বিক্রেতারা।
বাজারে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটারে ১০ থেকে ১২ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বাজারে তেলের সংকটসহ বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে ইচ্ছেমাফিক টাকা আদায় করছেন। এক সপ্তাহ আগে বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৮ টাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১৮২ টাকায়। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার নির্ধারিত মূল্য ১৪৩ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬২ টাকায়। প্রতি লিটার পাম তেলের মূল্য ১৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়। বাজারে মাছের দাম কিছুটা সাধ্যের মধ্যে থাকলেও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে চাল, আটা, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাদ্যপণ্যের। হু হু করে দাম বাড়তে থাকায় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বিস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, চিকন চাল ৬৫ থেকে ৭০ এবং মাঝারি মানের চাল ৫২ থেকে ৫৮ টাকায়। খোলা আটা প্রতি কেজি ৩৫ টাকা, প্যাকেটজাত আটা ৪০ থেকে ৪৫ এবং খোলা ময়দা ৫০ থেকে ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই চিত্র দেখা গেছে সবজির বাজারেও। শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, বরবটি, পেঁপে, গাজর, টমেটো ও কাঁচামরিচের দাম নতুনভাবে না বাড়লেও রয়েছে অপরিবর্তিত। বাজারে প্রতি কেজি টমেটো ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, ফুলকপি ২৫-৩০, শিম ৩৫-৪০, শিমের বিচি ১০০, পেঁপে ২৫, বেগুন ৫৫-৬০ আর কাঁচামরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকায়।
চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজারে বাজার করতে আসেন দিনমজুর আনিস আলী। তিনি বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে আমার আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসেব মিলছে না। বর্তমানে পরিবারের জন্য ভালো তরকারির ব্যবস্থা করা আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এবার বছরের শুরু থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম বেশি ছিল। কিন্তু সপ্তাহ খানেকের ব্যবধানে তা দ্বিগুণে এসে ঠেকেছে।
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও মজুরি বা আয় বাড়েনি বেসরকারি চাকুরে রাশেদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘জিনিসের দাম ঠিকই বেড়েছে। বলতে গেলে লাগামছাড়া দাম বাড়ছে। কিন্তু আমার বেতন বাড়েনি। মাস শেষে বেতনের টাকা যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে পরিবারের জন্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পুরো মাস চালানো বড়ই মুশকিল।’
বাজার করে বাড়ি ফিরছিলেন আলী আহম্মদ। তিনি বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সামনের দিনে কীভাবে চলব, সেটা ভেবেই মাথা ঘুরছে।’ দ্রব্যমূল্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতিতে বিপাকে পড়ার কথা জানিয়ে অনিক চক্রবর্তী নামের আরেক ক্রেতা বলেন, ‘আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রতিদিন কাটছাঁট করতে হচ্ছে বাজারের তালিকা। বাধ্য হয়ে বাজার করা কমিয়ে দিয়েছি।’
খুচরা ব্যবসায়ীরা রুবেল হাসান জানান, পাইকারি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাদ্যপণ্যের সংকট থাকায় তাঁরা সঠিক সময়ে সরবরাহ পাচ্ছেন না। তাই বাজারে এর প্রভাব পড়ায় বেড়েছে প্রতিটি পণ্যের দাম। চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী শাকিল মিয়া বলেন, ‘পাইকারেরা তেল, আটা, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের সংকট দেখিয়ে সঠিক সময়ে তা আমাদের দিচ্ছেন না। এ ছাড়া অর্ডারের অর্ধেক পরিমাণ মালামাল দিলেও তাতে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। বাধ্য হয়ে বেশি দামে মালামাল বিক্রি করতে হচ্ছে।’
চুয়াডাঙ্গা জেলা বাজার কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছি। বাজারের কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে অতিরিক্ত নিলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমিসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। সত্যি বলতে, এখন বাজার মনিটরিং আরও বেশি করা হচ্ছে। কোথাও কোনো অভিযোগ পেলেই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সজল আহমেদ জানান, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে জরিমানাও করা হচ্ছে। কোনোভাবেই নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে অস্থিরতা মেনে নেওয়া হবে না। এছাড়া এই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘আমরা তেলসহ যেকোনো নিত্যপণ্যের জন্য পাকা রসিদ (ছাপানো রসিদ) রাখতে বলছি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
