চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ওষুধ যায় কোথায়?

আপলোড তারিখঃ 2022-01-09 ইং
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ওষুধ যায় কোথায়? ছবির ক্যাপশন:

সুচিকিৎসা পাওয়া দেশের নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা জেলার মানুষ সুচিকিৎসা তো দূরের কথা, চিকিৎসা কি পাচ্ছেন? হাসপাতালে প্রতিটি চিকিৎসকের কক্ষে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবাধ বিচরণ। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের থেকে উৎকোচ নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখছেন ডাক্তারা। আর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা নজরও রাখছেন রোগীদের প্রেসক্রিপশনে। শুধু তাই নয়,  হাসপাতালে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী আর দালালদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে রোগীদের পকেট কাটা হচ্ছে। প্রতিটি রোগীকে হাসপাতালের সরকারি ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরেই থেকেই। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এটি একটি নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে রোগীদের অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে ওয়ার্ডবয় পর্যন্ত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকায় রোগীরা কোনো প্রতিকার পান না। অনেক রোগী চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে ভিটে-জমি হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন।

‘আমরা গরিব মানুষ। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে এসেছি। আশা ছিল হাসপাতালে ভালো ডাক্তার দেখাব, সরকারি ওষুধও পাব। যে কারণে অনেক দূর থেকে, অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি। সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছি ১০টায়। আরও আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তারপর টিকেট পেয়েছি। ডাক্তারের কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেছি আরও ১ ঘণ্টা। ডাক্তার দেখে অনেক ওষুধ লিখেছে। যার সবগুলো ওষুধই কিনতে হবে বাইরের ফার্মেসি থেকে। হাসপাতাল থেকে দিয়েছে শুধুমাত্র ব্যাথার আর গ্যাসের ট্যাবলেট। যদি সকল ওষুধ বাইরের ফার্মেসি থেকেই কিনতে হয়, তাহলে হাসপাতালের ওষুধ কোথাই যায়?’ গতকাল শনিবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ওষুধ কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলছিলেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের নাসির হোসেন নামের এক ব্যক্তি।

এভাবে নিজেদের আক্ষেপের কথা বলছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। এবার জানা যাক হাসপাতালের অন্তঃবিভাগ (ওয়ার্ডে) ভর্তি রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা কী বলেন।

হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন মঞ্জুরা বেগম নামের এক রোগীর ছেলে শিপলুর রহমান বলেন, ‘চার দিন ধরে আমার মাকে নিয়ে হাসপাতালে রয়েছি। তিনি একসঙ্গে দুইটি রোগে ভুগছেন। চার দিনে আমাদের ওষুধ কিনতে হয়েছে ২ হাজার টাকারও বেশি। প্রতিদিন তিনশ থেকে পাঁচশ টাকার ওষুধ হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনতেই হয়। শুধুমাত্র একটি অ্যান্টিবায়োটিক ও একটি করে গ্যাসের ওষুধ হাসপাতাল থেকে দিচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে (প্রেসক্রিপশন) আরও অনেকগুলো ওষুধের উল্লেখ আছে, যা আমদেরকে হাসপাতাল থেকে দেওয়া হচ্ছে না। সরকার যে লাখ লাখ টাকার ওষুধ হাসপাতালে পাঠাচ্ছে, রোগীরা যদি সে ওষুধ নাই পাবে, তাহলে ওষুধগুলো কী হচ্ছে?’

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন বিউল হক নামের এক রোগীর স্ত্রী রোকেয়া খাতুন। তিনি বলেন, ‘প্রেসক্রিপশনের দুই পাতায় শুধু ওষুধ লেখা। ডাক্তাররা প্রেসক্রিপশন ভর্তি করে ওষুধ লিখছেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে দিনে একটি করে স্যালাইন ও দুইটা মাত্র ওষুধ পাচ্ছি। বাকি সব ওষুধ ফার্মেসি থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনের একটি ফার্মেসিতে পরিচিত মানুষ থাকায় ওষুধগুলো বাকিতে কিনে আনতে পারছি। হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলে ওষুধের টাকা দিয়ে যাব বলেছি। যদি সকল ওষুধ বাইরে থেকেই কিনতে হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থেকে লাভ কী? বাড়িতে থেকেই বাইরের ওষুধ কিনে খাওয়াতে পারতাম। হাসপাতালে সরকারি ভালো ভালো ওষুধ দেয় শুনেছি, কিন্তু এখন দেখছি হাসপাতালে ভর্তি থাকলে ভিটে জমিও বিক্রি করতে হবে।’

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি রোগীদের প্রয়োজনের ৯০ শতাংশ ওষুধ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীদের ১০০ শতাংশ ওষুধই হাসপাতাল থেকেই দেওয়া হয়। তবে রোগীরা বলেছেন, বেশির ভাগ ওষুধই তাঁদের বাইরে ফার্মেসি থেকে কিনতে বলা হয়।

গত বছরের নভেম্বর মাসের ২২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদের উপস্থাপিত এক গবেষণা প্রবন্ধে জানানো হয়, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মাত্র ৩ শতাংশ রোগী ওষুধ এবং ১৪.৯ শতাংশ রোগী পরীক্ষা-নিরীক্ষা পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা গ্রহণকারী ৯৭ শতাংশ রোগীকে টাকা খরচ করে ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয় এবং ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে সেবা গ্রহণ করতে হয়। ফলে রোগীর ব্যয় বেড়ে যায় এবং প্রায়ই রোগী আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন।

এবিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে না এমন হওয়ার কথা নয়। হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ রয়েছে। চিকিৎসকদের হাসপাতালের ওষুধই লেখার কথা। তবে প্রয়োজনে দুই একটা ওষুধ বাইরের লিখতেই পারেন। এ বিষয়ে হাসপাতালের সকল কনসালটেন্টদের বলা রয়েছে, ওষুধ সরবরাহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা হাসপাতালের ওষুধই যেন লেখেন। এবং রোগীদের ছুটি পরবর্তী প্রেসক্রিপশনেও হাসপাতালের ওষুধই যেন দেওয়া হয়।’

হাসপাতালের মধ্যে ও চিকিৎসকের কক্ষের বাইরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবস্থানের বিষয়ে এই কর্তকর্তা বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সপ্তাহে দুই দিন শুধুমাত্র রোববার ও বুধবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের জন্য হাসপাতালের দুই ভবনের দেওয়ালের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের দিন ও সময় নির্ধারণ করে লেখাও আছে।’

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)