চুয়াডাঙ্গায় যেভাবে আস্থা প্রকল্পের আর্বিভাব

আপলোড তারিখঃ 2022-01-01 ইং
চুয়াডাঙ্গায় যেভাবে আস্থা প্রকল্পের আর্বিভাব ছবির ক্যাপশন:

ঠিক যেন হঠাৎ করেই চুয়াডাঙ্গায় আস্থা প্রকল্পের আর্বিভাব ঘটেছিল। জেলার সদর হাসপাতালে প্রথম দিকে ধাপে ধাপে বেশ কয়েকজনকে নিয়োগ দেওয়া হলে বিষয়টি সাধারণ মানুষের নজরে আসে। এরপরেই জানা যায় করোনা মহামারিতে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসার গতিকে বেগবান করতে ৭০ জন কর্মী নিয়োগ দেবে আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সার্ভিস। এরপর থেকে এই আস্থা নামক প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিস বিভিন্ন ধাপে সদর হাসপাতালসহ জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইশর অধিক জনবল নিয়োগ দিয়েছে।

চুয়াডাঙ্গাতেই কেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় আস্থা প্রকল্প এত কর্মীকে নিয়োগ করেছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান সময়ের সমীকরণকে বলেছিলেন, ‘চলতি বছরের (২০২১) জুলাই মাসের ৭ তারিখ গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি আমার অফিসে এসে পৌঁছায়। চিঠিতে জানানো হয়- করোনা মহামারিতে মানুষের সেবার লক্ষে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বিভিন্নপদে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে চায়  তারা। এটি অলাভজনক এবং সেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগকৃত লোকবলের বেতন ও ভাতার সকল ব্যয় গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেড বহন করবে। যেহেতু হাসপাতালে লোকবল সংকট, সে কারণে আমি গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক স্বাক্ষরিত চিঠির জবাবে লিখি, যদি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক অনুমতি দেন তাহলে লোকবলের বিষয়ে জানানো হবে। ২০২১ সালের জুলাই মাসের ২৫ তারিখ আমি এই লোকবলের নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক বরাবর অনুমতি সংক্রান্ত একটি চিঠি প্রেরণ করি। আগস্ট মাসের ৫ তারিখ স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালকের পক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক অনুমতি দিয়ে চিঠি দেন।

এসময় আমি গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেডের কাছে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে চিঠি প্রেরণ করি। এরপর ১৯ আগস্ট গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেড জনবল সরবরাহের জন্য চুক্তিপত্রের মাধ্যম চিঠি পাঠায়। এসময় আমি তাঁদেরকে জানায়, করোনাকালীন সময়ে অনেকে হাসপাতালে স্বেচ্ছাবেক হিসেবে কাজ করেছে তাদেরকেও এই নিয়োগের মধ্যে নিতে হবে। তারা রাজিও হয়।’

গত ডিসেম্বর মাসের ১৩ তারিখে এক সাক্ষাতকালে জেলা সিভিল সার্জন প্রতিবেদককে আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সাভির্স যে চিঠিতে এ জেলায় জনবল নিয়োগ দিতে চায় বলে জানিয়ে ছিল, সেই চিঠিটি দেখান। এসময় সিভিল সার্জন প্রতিবেদককে এই জনবল নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক বরাবর অনুমতি চাওয়া সংক্রান্ত চিঠিসহ বিভিন্ন আদান প্রদানকৃত চিঠির ফটোকপি ও নিয়োগপ্রাপ্তদের কয়েকটি নিয়োগপত্রও দেখান। গোল্ডেন সার্ভিসের সঙ্গে আদান-প্রদানকৃত কয়েকটি চিঠি ও নিয়োগপত্রগুলোতে কোনো এক কর্মকর্তার সাক্ষর থাকলেও তাঁর নাম বা পদবি কিছুই উল্লেখ ছিল না। অথচ জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আস্থা প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিসের নামে জনবল নিয়োগের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর যে চিঠি সিভিল সার্জন প্রেরণ করেছেন, তাতে নিজের নাম, পদবি ও যোগাযোগের মোবাইল নম্বর সকল কিছুই উল্লেখ আছে।

ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে জেলা সিভিল সার্জন কীভাবে এ ধরনের নিয়োগপত্রের ওপর ভরসা করে এতগুলো মানুষকে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ দেন, বিষয়টি নিয়ে নানাবিধ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দুই শতাধিক কর্মীর বেতন প্রকল্পটি কোথা থেকে দেবে? এই প্রকল্পের টাকার উৎস কী? যদি এই প্রকল্পটি অলাভজনক এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানই হবে, তবে কেন এই প্রকল্পে নিয়োগের সময় অর্থ বাণিজ্যের ঘটনা ঘটছে? এখন যদি প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে সিভিল সার্জন কীভাবে এতগুলো কর্মীর বেতন পরিশোধ করবেন? তিনি প্রকল্পের নিকট থেকে জামানত হিসেবে কোনো টাকা রেখেছেন কী?

এদিকে, গত ২০২১ সালের অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখে আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সার্ভিসে চুয়াডাঙ্গা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়োগ পান আতিয়ার রহমান ও কহিনুর খাতুন দম্পতি। নিয়োগের পরে ২৬ দিন কাজও করেছেন তাঁরা। তবে আস্থা প্রকল্পের ওয়ার্ড মাস্টার রাকিব পরবর্তীতে তাঁদেরকে জানান যে তাঁদের নিয়োগ সঠিক হয়নি। তাঁদেরকে আস্থা প্রকল্প নিয়োগ দেয়নি।

প্রতারণার শিকার আতিয়ার রহমান ও কহিনুর খাতুন দম্পতি জানান, তাঁদের নিকটাত্মীয় ওমর ফারুক ও আশরাফুল দুজনের মাধ্যমে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় এই প্রকল্পে নিয়োগ নেন তাঁরা। ২৬ দিন কাজ করার পরে তাঁদের টাকা দিয়ে নিয়োগ নেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে হাসপাতাল থেকে তাঁদেরকে বের করে দেন ওয়ার্ড মাস্টার। পরবর্তীর্তে এই দম্পতি দর্শনা থানায় আশরাফুল ও ওমর ফারুকের নামে একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।

আতিয়ার রহমান আরও বলেন, ‘আমরা গ্রামের মানুষ, শহরের এইসব চাকরির বিষয়ে কিছুই জানতাম না। অক্টোবর মাসের শুরুতে আমার খালাতো ভাই ওমর ফারুক জানায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ৩ বছরের প্রকল্পে আশরাফুল নামের একজন চাকরি দিয়ে দিতে পারবে। আস্থা প্রকল্পের একজন বড় কর্মকর্তার সঙ্গে আশরাফুলের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ধীরে ধীরে প্রকল্পটি সরকারি হয়ে যাবে বলেও জানায়। এসময় আমি ও আমার স্ত্রী দুজনেই এই চাকরির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করি। এরই মধ্যে এক দিন ওমর ফারুক, আশরাফুল নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দেয়। সেসময় আশরাফুল জানায় এই চাকরির জন্য তার নিকট দুই লাখ টাকা দিতে হবে। হাসপাতালের চাকরি আর সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের জন্য সরকারি নিয়োগ এলেই আমাদেরকে নেওয়া হবে এই ভেবে আমরা রাজি হয়ে যায়। সে মাসেরই ২৯ তারিখে আমরা আমাদের নিয়োগপত্র হাতে পেলে নভেম্বর মাসের ১ তারিখে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা আশরাফুল ও ওমর ফারুকের হাতে দিই। পরবর্তীতে আরও ৬৬ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা আর দিতে পারিনি। বিভিন্ন মানুষের নিকট থেকে ধার-কর্য নেওয়াসহ অনেক কষ্ট করে আমরা এই টাকা জোগাড় করেছিলাম।’

প্রতারণার শিকার ওই দম্পতির বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘সিভিল সার্জনের মাধ্যমে এই নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা সরাসরি আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সার্ভিসের নিয়োগকৃত ওয়ার্ড মাস্টারের নিকট যোগাযোগ করেছে। তার নির্দেশেই তারা হাসপাতালে ২৬ দিন কাজ করেছে।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গোল্ডেন সার্ভিসের নিয়োগপত্র নিয়ে যারা হাসপাতালে এসেছে, তাদের মধ্যে আতিয়ার রহমান ও কহিনুর খাতুন দম্পতি ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা দিয়ে নিয়োগ নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছে। তবে তাঁদের এই নিয়োগ গোল্ডেন সার্ভিস দিয়েছে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’

টাকা দিয়ে নিয়োগ নেওয়া ওই দম্পতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান বলেন, ‘এই দম্পতির বিষয়ে প্রথমে কিছু না জানতে পারলেও পরবর্তীতে টাকা দিয়ে নিয়োগের বিষয়টি জানতে পারি। তবে তাদের নিয়োগপত্রটি গোল্ডেন সার্ভিসের নিয়োগকৃত নয়। তারা কারও থেকে প্রতারিত হয়েছে এবং ভুয়া নিয়োগপত্র পেয়েছে। তাঁদের নিয়োগপত্রের সঠিকতা না থাকায় হাসপাতালে তাদের ডিউটি শিফ্ট বাতিলও করা হয়েছে।’

এদিকে পাশ্ববর্তী জেলা মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে আস্থা প্রকল্প বা এর আওতায় গোল্ডেন সার্ভিসের কোনো কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এই প্রকল্প শুধুমাত্র চুয়াডাঙ্গাতেই জনবল নিয়োগ করেছে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)