ছবির ক্যাপশন:
কালীগঞ্জে জলাশয় না থাকায় পাটচাষিদের পাট এখন গলার কাটা
প্রতিবেদক, কালীগঞ্জ:
ফলন হয়েছে বেশ। দামও ভালো। তাই হাসি-খুশিতে আছেন কৃষকেরা। বলছেন, সোনালী আঁশের সেই সোনালী দিন ফিরে এসেছে। কিন্তু পরে বোপন করা পাটের সুখবর নেই। পচানোর জন্য যথেষ্ট জলাশয় না থাকায় নাবি পাটচাষিদের জন্য পাট এখন গলার কাটা। কারও পাট এখনও খেতে আবার কারও পাট কেটে ফেলে রেখে শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, আগের দিনের মতো গ্রামের পতিত জলাশয় নেই বললেই চলে। এগুলো সব ভরাট করে চাষাবাদের উপযোগী হয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হাঁটু পানিতে কাঁদার মধ্যে ডুবিয়ে রাখছেন পাট। তা ছাড়াও আগের দিনের মতো বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিও হয় না। সর্বোপরি প্রত্যন্তাঞ্চলের খালগুলো সব ভরাট হয়ে পানি নেই। এমন অবস্থা ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার প্রায় সকল মাঠের। কৃষকেরা বলছেন, নদী ও খালগুলো খনন করতে পারলে সত্যি সত্যিই ফিরে আসবে সোনালী আঁশের সোনালী দিন।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে এ উপজেলার পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিলে ১ হাজার ৭৫০ হেক্টর। কিন্তু চাষ হয়েছে ১ হাজার ৮১৯ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ বেশি চাষ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই জে আরও ৫২৪ জাতের। যা ফলনও হয়েছে দেখার মতো। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ ভাগেরও বেশি কৃষকেরা কেটে ফেলেছেন। নাবী জাতের পাট অর্থাৎ বাকিগুলো পানির অভাবে কৃষকেরা পচাতে পারছেন না। কিন্তু বাজারে পাটের দাম ভালো তারপরও পাটকাঠি বিক্রি করে আসবে আরও বেশ টাকা। ফলে ফুরফুরে মেজাজে আছেন কৃষক।
উপজেলার কামালহাট গ্রামের কৃষক নিমাই চন্দ্র বিশ্বাস জানান, চলতি বছরের নাবি পাট নিয়ে কৃষকেরা খানিকটা বেকায়দায় আছেন। কেউ কেউ হাঁটু পানিতে কোনো রকমে চাপা দিয়ে রাখছেন পাট। আবার কেউ কেউ জলাশয় ভাড়া নিয়ে পাট পচাতে বাধ্য হচ্ছেন। কেননা আগের দিনের মতো জলাশয় নেই। তাঁদের গ্রামের পাশে কোন নদী উন্মুক্ত জলাশয় নেই। গ্রামের পাশ দিয়ে আশপাশের কয়েক গ্রাম ঘেষে একটি খাল বয়ে গেলেও সেখানে মাটি ভরাট হয়ে পানি একেবারে নেই বললেই চলে।
ওই গ্রামের পাটচাষী আব্দুর রশিদ জানান, জলাশয় না থাকায় তাদের গ্রামের কৃষ্ণ কুমার বিশ্বাসের মাত্র এক-দেড় ফুটের মতো জলাশয়ের নিচু ধান চাষের জমিতে বেশ কিছু পাটচাষি পাট পচাতে দিয়েছেন। বিনিময়ে জমির মালিককে মূল্যবান পাটকাঠি অর্ধেকটা দিতে হবে।
খড়িকাডাঙ্গা গ্রামের পাটচাষি আব্দুল হালিম জানান, তিনি এ বছর ১০ কাঠা জমিতে পাট চাষ করেছেন। পাট কাটার আগে খেতে থাকা অবস্থায় গ্রামের শহিদুল বিশ্বাসের মাছচাষ করা বেশ গভীর জলাশয়ে প্রতিবিঘা জমির পাটের জন্য ১ হাজার টাকার চুক্তিতে জলাশয় ভাড়া নিয়ে বেশ কয়েকজন পাটচাষি পাট পচাতে দিয়েছেন।
ওই গ্রামের পাটচাষি মতিয়ার রহমান খাঁ জানান, তাঁদের গ্রামটির পাশ ঘেষে বেশ বিছু গ্রামের মধ্যদিয়ে একটি খাল প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখন সে খাল মাটি ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষার মৌসুমেও পানি নেই। ফলে পাট পচানোর কোনো সুযোগ নেই। উপজেলার বলরামপুর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম খোকন জানান, এ বছর তিনি মোট ২৮ বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। এরমধ্যে কিছু আছে নিজের জমি বাকিটা বলিদাপাড়া মাঠে বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। কিন্তু এ মাঠের প্রায় ১৬ বিঘা বর্গা চাষের পাট পচানো নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। এ এলাকায় উন্মুক্ত জলাশয় না থাকায় এখন ট্রাক্টরে করে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে নিয়ে বলাকান্দরের খালে পাট পচাতে দিচ্ছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিকদার মোহাম্মদ মোহাইমেন আক্তার জানান, এ উপজেলাতে পাট উৎপাদন হয়েছে আগের দিনের মতো। ফলন ও দাম সব কিছুতে কৃষক মহাখুশি। এ পর্যন্ত এখানকার প্রায় ৭০ ভাগের বেশি পাট কৃষকের ঘরে উঠে গেছে। কিন্তু উন্মুক্ত জলাশয় না থাকায় নাবি পাট পচানো নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন কৃষক। পাট উৎপাদনে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের অংশ কালীগঞ্জেও এখন পাট চাষে ঝুঁকেছেন। কিন্তু প্রয়োজন পাট পচানোর জন্য ভরাট হয়ে যাওয়া খাল ও নদী খননের ব্যবস্থা করা।
