ঝিনাইদহের হলিধানীতে মিলল নকল সার কারখানার সন্ধান
প্রতিবেদক, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় একটি নকল সার কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। সরকারের অনুমোদন ব্যতিরেখেই রাতের আধারে একটি চালের চাতালে নকল সার উৎপাদন করে অন্য কোম্পানির নামে বাজারজাত করছে, এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ১৬ মাইল কোলা নামক স্থানে একটি নামহীন চাতালের এক পাশে প্রায় ২ বছর ধরে এই নকল সার উৎপাদন করে আসছেন এই গ্রামের আফজাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তিনি এর আগে সিডো নামে একটি এনজিও পরিচালনা করতেন।
গতকাল সোমবার দুপুরে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগের ভিত্তিতে এই চাতালে গিয়ে দেখা যায়, চারজন শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের কাছে এই সার কোম্পানির নাম কি, সাইনবোর্ড কোথায়, মালিক কে? জানতে চাইলে কোম্পানির নাম বললেও মালিকের নাম জানায়নি, দেখাতে পারেননি কোনো সাইনবোর্ড। এই কারখানায় নেই কোনো ল্যাব। যারা কাজ করছেন, এদের মধ্যে তুহিন হোসেন ও মুরাদ হোসেনের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার ছোট বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে। তাঁরা ২ জনেই মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতন পান। এছাড়া মঙ্গল হোসেন ম্যানেজার ও কোলা গ্রামের শফিউদ্দিন নামের আরও দুজনের দেখা পাওয়া যায়নি। তারা দস্তা সার উৎপাদন করে। প্রতিমাসে কয়েক টন করে ভেজাল ও নকল সার ঢাকাসহ দেশের অন্য অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে কোলা গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
জানা গেছে, এর আগেও কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত এই কারখানায় হানা দেয়। কিন্তু তাতেও থেমে থাকেনি তাঁদের কার্যক্রম। তারা অন্য কোম্পানির সালফেট (চাইনা সালফেট) কিনে অ্যাস ও সালফিউরিক এসিড মিশিয়ে দস্তা সার তৈরি করে। কিন্তু কোনো ল্যাবেই এই সারের মান পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। সবকিছু নির্ধারণ করেন শ্রমিক তুহিন ও মুরাদ। যারা ক্লাস ফাইভ পর্যন্তও লেখা পড়া জানেন না। সালিফিউরিক এসিড, অ্যাস ও সালফেট সারের দ্রবনে কি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, এই বিষয়ে তাঁদের কোনো জ্ঞান নেই।
সরকারি কোনো অনুমোদন আছে কি না জানতে গত রোববার ঝিনাইদহ সদর উপজেলা পরিষদের সামনে দেখা পাওয়া যায় আফজাল হোসেনের। তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর সকল লাইসেন্স রয়েছে, কিন্তু ঢাকায়। তাঁর দাবি, তিনি এখন সার উৎপাদন করছেন না। যখন করবেন, তখন দেখাবেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদুল করিম জানান, ‘আমার জানামতে এই কারখানায় এখন সার উৎপাদন হচ্ছে না। আমাদের লোক গত সপ্তাহে দেখে এসেছে। উনি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন।’
এেিদক, গত ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বরাবরে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়। এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সৈয়দ রফিকুল আমিন। চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, ১৬-০৮-২০২০ইং তারিখে জিংক সালফেট (হেপ্টা) তৈরি ও বাজারজাতকরণের জন্য আবেদন করেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে ৯-১২-২০২০ইং তারিখে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় সঠিক না হওয়ায় পুনরায় পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু লাইসেন্স না পেলেও তিনি সরকার ও মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে টন টন নকল সার উৎপাদন করে নামে-বেনামে বিক্রি করে যাচ্ছেন। তিনি বাজার থেকে এসকে এন্টারপ্রাইজের উৎপাদিত পটাসিয়াম সালফেট কিনেন। কিন্তু সেই কোম্পানির কাছ থেকে সার আমদানির কোনো কাগজপত্র নেই। কাঠের গুড়ো থেকে ছাই তৈরি করে এসিড মিশিয়ে জিংক সালফেট উৎপাদন করে যাচ্ছেন। প্রতিমাসে ৪ জন কর্মীকেই ৬০ হাজারের ওপরে বেতন দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, ল্যাব টেকনিশিয়ানও রয়েছে তার। কিন্তু নেই এসিড মজুদের কোনো সনদ, রাসায়নিক বর্জ্য নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা, নেই ল্যাব, পরিবেশের ছাড়পত্র ও সাইনবোর্ড। চাতালের অব্যবহৃত কক্ষেই এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কোলা গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানান, এখন সার দিয়েও ফসলে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। অধিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। নকল সারের কারণেই এমন হচ্ছে। পরিমাণে বেশি লাগছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। মাটির গুণাগুনও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এই বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের উপ-পরিচালক আনোয়ার সাদাত জানান, ‘আমি নতুন এসেছি। এই রকম সার কারখানা সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে যদি নকল সার উৎপাদন করে, তবে আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব। অবশ্যই সার ল্যাবে পরীক্ষা করে গুণগত মান যাচাই করা হবে।’
