ঝিনাইদহের পশ্চিমাঞ্চলের ৬ ক্লিনিকের বেহাল চিত্র!

আপলোড তারিখঃ 2020-12-08 ইং
ঝিনাইদহের পশ্চিমাঞ্চলের ৬ ক্লিনিকের বেহাল চিত্র! ছবির ক্যাপশন:
ঝিনাইদহ অফিস: ‘কথায় আছে নামেই তালপুকুর কিন্তু ঘটি ডোবে না’ বহুল প্রচলিত এই প্রবাদের মতোই অবস্থা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর। ঝিনাইদহের সুরম্য ভবন, তাতে এসি লাগানো। চোখ ধাঁধানো সাইনবোর্ডে লেখা অভিজ্ঞ সব চিকিৎসকদের নাম। কিন্তু কোথাও তাঁদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সদরের সাধুহাটি ও সাগান্না ইউনিয়নের ৬টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করে চরম অব্যবস্থাপনার তথ্য মিলেছে। আদালতের নির্দেশে একজন পুলিশ কর্মকর্তার তদন্তেও উঠে আসে ঝিনাইদহ স্বাস্থ্য বিভাগের বেহাল চিত্র। সরেজমিন সাধুহাটি মোড়ের রাহেলা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করে দেখা যায়, সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই। নেই প্রশিক্ষিত নার্স। নার্সের কাজ করেন আয়া রত্না খাতুন ও লিমা পারভিন সুখি। তাঁদের নেই কোনো অভিজ্ঞতা বা পড়ালেখার সনদ। হাসপাতালটির মালিক ডা. সোহরাব হোসেন অনুপস্থিত ছিলেন। হাসপাতালটির পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। নবায়নের অপেক্ষায় থাকা হাসপাতালটিতে দোকান ঘরের মধ্যে বেড পেতে রোগী রাখা হয়েছে। আর এখানেই জটিল ও কঠিন অপারেশন করেন চুয়াডাঙ্গার চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডা. মশিউর রহমান ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক জি এম ডালিম। ঝিনাইদহের কোনো চিকিৎসক সেখানে যান না বলে উল্লেখ করেন রাহেলা হাসপাতালের কথিত প্যাথলজিস্ট টুটুল আহম্মেদ। একই অবস্থায় চলছে ডাকবাংলা বাজারের আল-জিজিয়া হাসপাতাল। সেখানেও সার্বক্ষণিক কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। নেই প্রশিক্ষিত নার্স। অ্যাপ্রোন পরে কাজ করছেন রেশমা ও মুসলিমা খাতুন নামে দুই যুবতী। তবে তাঁদের কোনো সনদ নেই। চাহিদা মাফিক বেতন না দেওয়ায় এই ক্লিনিকে কোনো নার্স থাকেন না। ক্লিনিকের মালিক আব্দুল মান্নানকে পাওয়া যায়নি। ডাকবাংলা নার্সিং হোমে গিয়ে দেখা যায়, তদন্ত দলের আসার খবরে সবেমাত্র হাসপাতালে ধোয়া-মোছার কাজ করা হয়েছে। ক্লিনিক মালিক আসাদুজ্জামান কাজল জানালেন, তাঁদের সর্বশেষ নবায়ন করা হয় ২০১২ সালে। সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই। নেই ডিপ্লোমাধারী নার্স। চম্পা ও রেখা নামে দুই নার্স অফিসে ছিলেন। ছুটিতে আছেন হিরা ও নাসিমা। তাদেরও কোনো সনদ নেই। শফিকুল ইসলাম নামে একজন কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) কাজ করেন। ডাকবাংলা বাজারের আল-আকসা ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি তালাবদ্ধ ছিল। তদন্ত দলের যাওয়া দেখে তালা খুলে দেন মধুহাটি গ্রামের আব্দুল জলিল। তাঁর ছেলে ডা. ফাইনুল ইসলাম কুষ্টিয়ার কুমারখালী ডায়াবেটিক সমিতির জেনারেল ফিজিশিয়ান। আল-আকসা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রবেশ করে চক্ষু চড়ক গাছে উঠল। সুরম্য ভবনে আল্ট্রাসনো ও ইসিজি রুমে বিছানা, বালিশ কাথা বিছানো। রুমের মধ্যে দিয়ে উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে। সাইনবোর্ডে কুষ্টিয়া সনো হাসপাতালের ডা. শামীমা সুলতানা, হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. মো. জিল্লুর রহমান, ডা. উম্মে কুলসুম, শৈলকুপা ডায়াবেটিক সমিতির ডা. খালিদ সাইফুল্লাহ, যশোর মেডিকেল হাসপাতালের শাহিনুর আক্তার ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. সাজেদুর রহমানের নাম থাকলেও তাঁদের নেই কোনো চেম্বার। ক্লিনিকটিতে উপস্থিত আব্দুল জলিল জানান, তিন মাসে আগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কোনো রোগী দেখা হয় না। তবে ক্লিনিকটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও কোনো প্যাথলজিস্ট পাওয়া যায়নি। ডাকবাংলা বাজারের ইসলামী (প্রা.) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। নেই প্রশিক্ষিত নার্স। হাসপাতালের প্যাডে ডা. আব্দুল্লাহ, ডা. সাদ্দাম ও ডাক্তার পলাশের নাম লেখা আছে। কিন্তু পলাশ ও সাদ্দাম দুজনেই সেকমো, এমবিবিএস চিকিৎসক নন। তদন্ত দলের সামনে উপস্থিত নার্স পরিচয়দানকারী মিনা ও নাসরিনের কোনো সনদ নেই। ইসলামী (প্রা.) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট প্রস্তুত করাই আছে। বর্ত্যায় ঘটলে রিপোর্ট হাতে লিখে দেওয়া হয়। ইসলামী (প্রা.) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুন্সি শাহিন রেজা সাইদ জানান, সেবামূলক কাজের জন্যই ক্লিনিকটি চালু রেখেছেন। হাসপাতালের নেই কোনো লাইসেন্স। নবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও জানান। সাগান্না ইউনিয়নের বৈডাঙ্গা প্রাইভেট হাসপাতালে কোনো রোগী নেই। নেই সার্বক্ষণিক চিকিৎসক। রেক্সোনা খাতুন নামে এক মহিলা সেখানে নার্সের কাজ করেন। তার স্বামী থাকেন বিদেশে। সন্তান নিয়ে ওই ক্লিনিকের নার্স ডিউটি রুমে বসবাস করেন। সেখানে রান্না ও রাত যাপনের ব্যবস্থা আছে। বৈডাঙ্গা হাসপাতালে কোনো রোগী নেই। বেডগুলো ধুলোবালিতে ভরে গেছে। পরিবেশ মানসম্মত নয়। তারপরও ২০২১ সাল পর্যন্ত সরকারি ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের অপেক্ষায় আছেন পরিচালক ফারুক ও রানা। তাদের ভিজিটিং কার্ডে লেখা আছে ‘এখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা রোগী দেখানো হয়। অত্যাধুনিক কম্পিউটারাইজড ডিজিটাল মেশিনের মাধ্যমে নির্ভুলভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়’ তবে বাস্তবে সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই, নেই কোনো প্যাথলজিক্যাল সরঞ্জাম। অবাস্তব আর কল্পকাহিনীর ফাঁদে পড়ে হাসপাতালটিতে মানুষ অহরহ প্রতারিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে হাসপাতালটির অব্যবস্থাপনায় বেশ কয়েকজন রোগীর মৃত্যুও হয়েছে। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, আমি এসব ক্লিনিক ভিজিট করে বিস্মিত হয়েছি। কীভাবে এসব ক্লিনিক বছরের পর বছর চলে আসছে সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, ক্লিনিকগুলোর কোনো মান নেই। চিকিৎসার কোনো পরিবেশ নেই। আমি মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বন্ধের জন্য চিঠি পাঠিয়েছি। উল্লেখ্য, বিভিন্ন পত্রিকায় গত ২১ আগস্ট ঝিনাইদহের ১৬৯ ক্লিনিক ও ল্যাব লাইসন্সে ছাড়াই চলছে’ শিরোনামে তথ্য-ভিত্তিক সংবাদ প্রকাশিত হলে ঝিনাইদহ আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়। বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)