শনাক্তের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ : পরীক্ষায় সর্বনিম্ন

আপলোড তারিখঃ 2020-08-17 ইং
শনাক্তের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ : পরীক্ষায় সর্বনিম্ন ছবির ক্যাপশন:
বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নিলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে সমীকরণ প্রতিবেদন: দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা শনাক্তের হার সম্প্রতি কিছুটা কমলেও প্রতিদিনই নমুনা পরীক্ষার রেকর্ড করেছে ভারত। আর শনাক্তের হারে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে থাকলেও নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কমছে বাংলাদেশে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১৫ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ‘বেশি দিন লাগবে না, দেশ থেকে করোনাভাইরাস এমনিই বিদায় নেবে।’ করোনা রোগী না থাকায় কিছু ‘কোভিড-১৯’ হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে অনুমানের ভিত্তিতে মহামারী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়া হলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশের ন্যায় প্রায় একই পন্থা অনুসরণ হচ্ছে পাকিস্তানে। ভারতের চেয়ে শনাক্তের হার চার শতাংশ বেশি থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানে নমুনা পরীক্ষার আওতা কমিয়ে দেয়া হয়েছে, এতে করোনা শনাক্তের সংখ্যাও কম দেখাচ্ছে দেশটি। ভারতে গত এক সপ্তাহে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে, শনাক্তও হয়েছে রেকর্ডসংখ্যক করোনা। তবে দেশটিতে শনাক্তের হার কিছুদিন ধরে নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৬ আগস্ট রোববারের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬০৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে ভারতে একদিনে সর্বোচ্চ ৬৩ হাজার ৪৯০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এদিন দেশটিতে করোনা শনাক্তের হার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রতিদিন যে সংখ্যক মানুষের নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে, তারমধ্যে যত শতাংশের কোভিড-১৯ রিপোর্ট পজেটিভ আসছে তাকে বলা হচ্ছে ‘পজেটিভিটি রেট’ বা সংক্রমণ শনাক্তের হার। গত ১১ আগস্ট থেকেই ভারতে সংক্রমণের এই হার ৯ শতাংশের নিচে। ১৪ আগস্ট তা কমে হয় ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ। ১৫ আগস্ট আরও কমে গিয়ে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ দাঁড়ায়। তবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণ শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘অনুমানের ওপর নির্ভর করে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক নয়। করোনা কমছে কিনা তার কোন সার্ভে (জরিপ) হয়নি, বিজ্ঞানভিত্তিক কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নমুনা পরীক্ষা কখনও কমানো হচ্ছে, কখনও বাড়ানো হচ্ছে, এগুলো খামখেয়ালিপনা, হঠকারিতা। এগুলোর জবাবদিহিতা থাকা উচিৎ।’ তিনি বলেন, ‘বুলেটিন বন্ধ করাটা ছিল অত্যন্ত বাজে সিদ্ধান্ত। এখন আসছে হাসপাতাল কমানোর সিদ্ধান্ত। যখন বসুন্ধরা হাসপাতাল করা হলো, তখন আমরা বলেছি, হঠাৎ করে এমন হাসপাতাল করার দরকার নেই। বিদ্যমান হাসপাতালগুলো ঠিকভাবে কার্যকর রাখা দরকার। এসব বিষয়ে খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ, তথ্য উপাত্ত পরিস্থিতি এসবের ওপরে যদি সিদ্ধান্ত না নেই, তাহলে এসব ভুল হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটার ও জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রায় কাছাকাছি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। রোববার পর্যন্ত দেশটিতে দুই কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার ৭০৩ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, যাতে মোট ২৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মোট শনাক্তের হার ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ভারতে রোববার পর্যন্ত করোনায় ৫০ হাজার ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে বিশে^র তৃতীয় সর্বোচ্চ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ বা শনাক্তকরণে প্রায় একই পন্থা অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। দেশ দুটিতে নমুনা পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে কম হলেও শনাক্তের হার ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। পাকিস্তানে রোববার পর্যন্ত মোট ২২ লাখ ৭৭ হাজার ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা (টেস্ট) হয়েছে। এসব পরীক্ষায় দেশটিতে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। দেশটিতে মোট শনাক্তের ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সরকারি হিসেবে, করোনায় মোট ছয় হাজার ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে পাকিস্তানে। দেশটি করোনা সংক্রমণের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বর্তমানে ১৫তম স্থানে রয়েছে। শনাক্তের হারে শীর্ষে থাকলেও দেশে কমছে নমুনা পরীক্ষা: দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা শনাক্তের হারে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি শনাক্তের হার কিছুটা নিচের দিকে নামলেও বর্তমানে তা ২০ শতাংশের বেশি। এরপর দেশটিতে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা দিন দিন কমছে। নানা কারণে নাগরিকদের মধ্যেও নমুনা পরীক্ষায় আগ্রহ কমছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ও আওতা বৃদ্ধির কোন জোরালো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশে রোববার পর্যন্ত ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় মোট ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫৪৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষা বিবেচনায় দেশে মোট শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদফতরে রোববারের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৮৭টি ল্যাবে ১০ হাজার ১৮টি নমুনা পরীক্ষায় ২ হাজার ২৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। করোনায় দেশে মোট ৩ হাজার ৬৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। করোনা সংক্রমণের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বর্তমানে ১৬তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা ২৭ জুলাই সংস্থার নিয়মিত বুলেটিনে বলেন, ‘করোনার সর্বোচ্চ পর্যায় (পিক) এখন কমতির দিকে। নমুনা কমেছে। কেস এখন কমতির দিকে। যাদের দরকার, তারাই টেস্ট করছে। কেস কমার কারণে মানুষের আগ্রহও কম।’ সংক্রমণ কমছে-এমন দাবি করলেও এর কারণ সম্পর্কে ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কোন ক্ষেত্রে হয়তো টেস্টের ফির কারণেও মানুষ টেস্ট করতে আসে না। এই ফি নির্ধারণ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে আমাদের করার কিছু নেই। এই ফি দিয়েই পরীক্ষা করতে হবে।’ দেশে ২৬ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৪৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। এরপর কমতে থাকে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা। পরবর্তীতে গত ২ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের বুলেটিনে বলা হয়, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় মোট ১৮ হাজার ৩৬২টি নমুনা পরীক্ষা করে ৪ হাজার ১৯ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়, যা একদিনে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ শনাক্ত। পরদিনের বুলেটিনে বলা হয়, আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৪ হাজার ৬৫০টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩ হাজার ১১৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়। ২ জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নিয়মিত কমছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা। তবে শনাক্তের হারে এখন বিশে^ তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, দেশে মেক্সিকো ও ব্রাজিলের পরই নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হচ্ছে। নমুনা পরীক্ষা কমার আট কারণ: স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বয় কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে (গত ২০ জুলাই) করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য আটটি কারণ নির্ধারণ করা হয়। এরমধ্যে প্রথমে আছে নমুনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ। অন্য কারণগুলো হাসপাতাল ছাড়ার আগে রোগীর শরীরে করোনার অস্তিত্ব জানতে পরপর দুটি পরীক্ষা না করা, উপসর্গ নেই-এমন রোগীদের নমুনা প্রদানে আগ্রহ কমা, সার্বিকভাবে দেশে করোনার প্রকোপ কমে গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে টেস্ট করাচ্ছেন না, জীবিকা সংকটের মুখে পড়েছে বা পড়তে পারে-এই আশঙ্কায় অনেকে পরীক্ষা করাচ্ছেন না, রোগী গুরুতর অসুস্থ না হলে স্বাস্থ্য অধিদফতর বাড়িতে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়ার জন্য উৎসাহিত করছে এবং বন্যার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি হওয়ায় কোথাও কোথাও নমুনা পরীক্ষা কমে গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নমুনা পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ ও তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডে বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী দৈনিক ২৪ থেকে ২৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু গত জুলাইয়ের শুরুতে নমুনা পরীক্ষায় ৫০০ টাকা ফি বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর থেকেই নিয়মিত কমছে নমুনা পরীক্ষা বা নমুনা সংগ্রহ।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)