ছবির ক্যাপশন:
মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, হতে পারে ক্যানসারসহ ক্ষতিকর নানা রোগ
মেহেরাব্বিন সানভী:
চুয়াডাঙ্গার হাট-বাজারের অলিতে-গলিতে রয়েছে অসংখ্য চায়ের দোকান। মহামারি করোনাভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়ের দোকানগুলোতে নতুন করে স্থান পেয়েছে প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম চায়ের কাপ। ওয়ান টাইম চায়ের এ কাপ কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত ও ব্যবহারযোগ্য, তা না জেনেই হরহামেশায় চা-পানকারীরা চা পান করছেন। বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আসা এসব চায়ের কাপে চা পান করা সঠিক কি না, তা নিয়ে জনমনে বিভান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে চায়ের কোনো বিকল্পই নেই। অনেকের কাছে সকালে চা কিংবা কফি না হলে দিনটাই মাটি হয়ে যায়। দিনের শুরুতে কিংবা দিনের ক্লান্তি দূর করতে চায়ের দোকানে মানুষের সারা দিনই ভিড় লেগে থাকে। গতানুগতিক চায়ের কাপ ছেড়ে অনেকেই স্বাস্থ্যসম্মত বা নিরাপদ ভেবেই প্লাস্টিকের কাপে চা পান করছেন। এটি স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু নিরাপদ, তা ভেবে দেখা দরকার।
জেলার বেশ কয়েকজন চায়ের দোকানদার জানালেন, বাজারে করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ করে এই প্লাস্টিকের কাপের ব্যবহার ও কদর বেড়েছে। দোকানে চা খেতে আসা প্রায় সবাই ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের চা দেওয়ার অর্ডার করে থাকেন। দোকানিরা জানিয়েছেন ১ শ প্লাস্টিকের কাপ কিনতে ৮০ থেকে ৯০ টাকা লাগে। এই প্লাস্টিকের কাপ থেকে রোগ ছড়াতে পারে কি না, তা তাদের জানা নেই।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রসায়নবিদ সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, থার্মোকলে থাকে থার্মোপ্লাস্টিক যৌগ পলিস্টাইরিন। স্টাইরিন ও ফেনিলিথিন পলিমারাইজেশনে পলিস্টাইরিন যৌগ তৈরি হয়। এটি বিষ। পাশাপাশি ‘ওয়ান টাইম’ পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ‘বিসফেনল এ’ ও নানা রাসায়নিক। আর এসব রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে প্রবেশ করে শরীরের ভারসাম্য নষ্টের পাশাপাশি কারণ হতে পারে ক্যানসারের। বস্তুটি দেখতে যতটা সাদা, এর কাজ ততটাই কালো। হালকা, সহজে পরিবহনযোগ্য ও সস্তা হওয়ায় অনেকে খাবারের প্লেট থেকে চায়ের কাপ সবকিছুতেই ‘ওয়ান টাইম’ পণ্য ব্যবহার করেন। এছাড়া পরিষ্কার করার ঝামেলা থেকে রেহাই পেতেও মানুষ বেছে নিচ্ছেন অস্বাস্থ্যকর এই পণ্য। পরিবেশবিজ্ঞানীরাও বলছেন, থার্মোকলের ব্যবহার বন্ধ হওয়া দরকার। এটি মাটির সঙ্গে মেশে না। গাছের পানি শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। থার্মোকল পোড়ালে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করে।
দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকতা আবু হেনা জামাল শুভ বলেন, প্লাস্টিকের মধ্যে আছে এক ধরনের রাসায়নিক ঘাতক। এটি নিয়মিত শরীরে ঢুকলে মহিলাদের ইস্ট্রোজেন হরমোনের কাজের স্বাভাবিকতা বিঘ্নিত হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণু কমে যায়। হার্ট, কিডনি, লিভার, ফুঁসফুঁস এবং ত্বক ও মারাত্মক রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি, স্তন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। গরম খাবার বা গরম পানীয় প্লাস্টিকের সংর্¯úশে এলে রাসায়নিক বিষ খাবারের সঙ্গে আন্তে আস্তে শরীরের সঙ্গে মিশে যায়।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শামীম কবির বলেন, ‘ওয়ান টাইম’ পণ্যে রাখা গরম খাবার ও পানীয় গ্রহণে হৃদরোগ, রক্তনালীর অসুখ, নারীদের ব্রেস্ট ও ওভারিয়ান ক্যানসার এবং পুরুষের প্রোস্টেট ক্যানসার, চর্মরোগ বেশকিছু রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তা ছাড়া এটি পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। যেখানে সেখানে ফেললে এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। আর তাছাড়া এগুলো যেখানে সেখানে ফেললে পরিবেশের ক্ষতিসহ এখন ডেঙ্গুর সময়। পানি জমে মশা তৈরি হতে পারে। এগুলো আবার রিসাইকেল করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এতে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য ‘বিসফেনল এ’ এক ধরনের ক্ষতিকর হরমোনের মতো কাজ করে, যেটা আমাদের শরীরের স্বাভাবিক হরমোন তৈরির কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। ‘ওয়ান টাইম’ পণ্যে ঠাণ্ডা খাবার রাখলে তেমন একটা ক্ষতি না হলেও গরম খাবার সংরক্ষণ করা ভয়ঙ্কর। গরম তাপে বেরিয়ে আসা রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে মিশে পাচনতন্ত্রে ঢুকে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
এনভায়রনমেন্ট সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)-এর জরিপ বলছে, দেশে প্রতি মাসে বেচাকেনা হয় ২৫০ টন ‘ওয়ান টাইম’ পণ্য। ডাস্টবিন থেকে যেসব প্লাস্টিক পণ্য নেওয়া হয়, তার মধ্যে আছে হাসপাতালের বর্জ্যও। কারখানায় রিসাইক্লিং করা পণ্য, বিশেষ করে থার্মোকলের বাসন ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত হয় না।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ‘ওয়ান টাইম’ কাপ এবং প্লেটের ব্যবহার কিছুটা বেড়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা যদি এ বিষয়ে জানান যে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে আমরা এটি ব্যবহার বন্ধ করতে উদ্যোগ নেব। মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ক্ষতি করে, এমন পণ্য ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করা হবে। আমরা এটির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
