ছবির ক্যাপশন:
* চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা ৭৮ লাখ লিটার
* চাহিদার ৫৫ ভাগ পানি সরবরাহের টার্গেট নিয়েও ব্যর্থ পৌর কর্তৃপক্ষ
* বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ পানি সমস্যার মূল অন্তরায় : পৌর মেয়র
* ৩৩ হাজারের স্থলে ২৪ হাজার কেভি সরবরাহ, ফলে লো-ভোল্টেজ: চুয়াওজোপাডিকো
* চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলায় বিদ্যুতর লো-ভোল্টেজ
* করোনায় থেমে আছে ঝিনাইদহে নির্মাণাধীন জাতীয় সুপার সাব গ্রিড স্টেশনের কাজ
* স্টেশনটি চালু হলে, থাকবে না লো-ভোল্টেজ, মিটতে পারে পানির সমস্যা
এম এ মামুন:
বছর বছর বাড়ছে পৌর করের বোঝা। শহরজুড়ে প্রতিটি পানি সাপ্লাইয়ের লাইনে লাগানো হয়েছে পানির মিটার। প্রকারভেদে পৌরবাসীকে প্রতিমাসে গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের পানির বিল। কিন্ত তারপরেও মিলছে না সুপেয় পানি। চলছে না নাওয়া-খাওয়া ও গৃহস্থলীর কাজ। যদিও দিনে দু-একবার পানি দেওয়া হচ্ছে, তবে সে পানিতে থাকছে ময়লাসহ নানা প্রকার নোংরা-আবর্জনা। সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গার প্রায় দুই লাখ পৌরবাসী পানির সমস্যায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ পানি সমস্যার মূল অন্তরায়। নিয়মানুযায়ী প্রতিদিন যেখানে চারবার পানি সাপ্লাই দেওয়ার কথা, সেখানে পৌর কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছে।
১৯৮৫ সালে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায় তিনটি ওভারহেড পানির পাম্পের মাধ্যমে পৌরবাসীকে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটানোর কাজ শুরু হয়। বর্তমানে যদিও পৌরসভায় মোট ১০টি পানির পাম্প চালু রয়েছে এবং আরও ৫টি পাম্প চালুর অপেক্ষায়। পৌরসভার মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার নাগরিকের জন্য প্রতিদিন পানির চাহিদা ৭৮ লাখ লিটার। সেখানে পৌর কর্তৃপক্ষ শতভাগ চাহিদার মাত্র ৫৫ ভাগ সরবরাহ করার টার্গেট নিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু পানি সরবরাহের ব্যর্থতা স্বীকার করে জানান, তিনি পৌরবাসীর পানির সমস্যা সমাধানে সর্বাক্তক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের লো-ভোল্টেজের কারণে পানির পাম্প চালাতে সমস্যা হচ্ছে। লো-ভোল্টেজে পাম্প চালালে পাম্পগুলোর মোটর পুড়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে মোটর পুড়ে গেলে পানি সাপ্লাইয়ের কাজ আরও বিঘ্নিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ অপারগতা প্রকাশ করেছে। বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হলে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ৬০ ভাগ গ্রাহককে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এদিকে, লো-ভোল্টেজের কারণে পানির পাম্প না চললেও পৌর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পৌরবাসীর পানির চাহিদা নিশ্চিত করতে জনস্বাস্থ প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে এডিপি ও জাইকার অর্থায়নে এবং জেলা শহর পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ১২ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে আরও ৫টি সাবমার্সিবল পানির পাম্প চালুর সব কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছে। এই পাম্পগুলো চালু হলে পৌরবাসীর শতকরা ৭৫ ভাগ পানি চাহিদা মেটানো সম্ভব বলেও মনে করেন পৌর মেয়র জিপু চৌধুরী। তবে সেক্ষেত্রেও আশঙ্কা রয়েছে লো-ভোল্টেজ। তাই সমস্যার সমাধান না হলে পানি সরবরাহ সমস্যা রয়েই যাবে।
এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগ চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঈনুল লো-ভোল্টেজের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র লো-ভোল্টেজের বিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। কিন্তু চুয়াডাঙ্গার জাফরপুর ১ লাখ ৩২ হাজার কেভির জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশন থেকে প্রতিদিন সরবরাহ ৩৩ হাজারর কেভির স্থলে সরবরাহ দিচ্ছে মাত্র ২৪ হাজার কেভি। ফলে লো-ভোল্টেজ হচ্ছে। তিনি আরও জানান, লো-ভোল্টেজের সমাধান একটাই, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় ৩৩ হাজার কেভির বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। আর এর একমাত্র সমাধান ঝিনাইদহ ২৩০/১৩২ কেভির জাতীয় সুপার সাব গ্রিড স্টেশনটি চালু করা।
এ ক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গা পৌরবাসীর পানির সমস্যার সমাধানের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েরেছ বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ। আর এটা কাটিয়ে ওঠাও রয়েছে অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে পৌরসাসীর পানি সমস্যার সমাধান সহজেই মিটছে না এমন তথ্যই মিলেছে।
বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা ১৩২ কেভি জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, ভেড়ামারা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) থেকে জাফরপুরে জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশনের সঞ্চালন লাইনে ১৩২ কেভি সরবরাহ করার কথা। কিন্ত ১৩২ কেভি সরবরাহ দিলেও ড্রপআউটের ফলে জাফরপুর গ্রিড স্টেশন পাচ্ছে ১১০ কেভি। এ কারণে জাফরপুর গ্রিড ওজোপাডিকোর বিতরণ লাইনে ৩৩ কেভি সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকো বিতরণ কেন্দ্র লো-ভোল্টেজ পাচ্ছে।
তবে, এই সমস্যার সমাধান করতে ভেড়ামারা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ২৩০/১৩২ কেভির সুপার গ্রিড স্টেশন স্থাপনের জন্য ৬ অর্থবছরের একটি প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়। গ্রিড স্টেশনের কাজটির কাজ করছে ভারতের সিমেন্স নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
ভেড়ামারা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) প্রজেক্ট ডিভিশনের সহকারী প্রকৌশলী হামিদুল ইসলাম জানান, গত ২০১৫ সালে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ সড়কের চুটলিয়া তেঁতুলতলা নামক স্থানে ১৬.৪ একর জমির ওপর কয়েক শত কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০/১৩২ কেভির সুপার জাতীয় গ্রিড স্টেশনের অবকাঠামোসহ অন্যান্য নির্মাণকাজ শুরু হয়। নতুন এই গ্রিড স্টেশনটির কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা আছে ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর।
ইতিমধ্যে গ্রিড স্টেশনের প্রায় ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দেশে করোনা মহামারির কারণে গ্রিডের নির্মাণকাজ থেমে আছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রিড স্টেশনের কাজ শেষ হলে পিজিসিবি প্রজেক্ট ডিভিশন পিজিসিবি’র (সঞ্চালনের) কাছে হস্তান্তর করতে পারবে।
আর এই গ্রিড সেন্টশনটি চালু হলেই চুয়াডাঙ্গা তথা মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলায় বিদ্যুতর লো-ভোল্টেজ সমস্যার সমাধান হবে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে।
