ছবির ক্যাপশন:
মেহেরাব্বিন সানভী:
করোনাভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব আজ স্থবির। জীবন আজ চার দেওয়ালে বন্দী, পোষা পাখির ন্যায় খাঁচায় আটকে গেছে। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর গত সোমবার উদ্যাপিত হয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চুয়াডাঙ্গায় মাঠপর্যায়ে কাজ করা প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, পুলিশ, সাংবাদিকদের নিরানন্দভাবেই কেটেছে এবারের ঈদ। এবার ঈদের সেই চিরচেনা আনন্দের রূপে ঘাটতি ছিল প্রচুর। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তায় থাকা সত্ত্বেও পেশাগত দায়িত্ব পালনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইনে থেকেই তাঁরা কাজ করেছেন মাঠপর্যায়ে। ছুটি ছিল না এবারের ঈদে। নিরানন্দ ঈদ হলেও হাসিমুখে চিকিৎসকেরা চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এবং পুলিশ সদস্যরা সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। সাংবাদিকেরা মানুষের কাছে সংবাদ পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে করোনা আতঙ্ক আর ঈদ কোনোটার তোয়াক্কা না করে ছুটে বেড়িয়েছেন জেলার এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
চুয়াডাঙ্গায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয়, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ এবং গরীব, অসহায় ও সংকটাপন্ন মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। করোনা সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে কেউ মারা গেলে অথবা শনাক্ত অবস্থায় কারো মৃত্যু হলে মৃতদের আত্মীয়-স্বজনও যখন দূরে থাকে তখন পুলিশ এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাই তাঁদের লাশ দাফনে এগিয়ে যাচ্ছেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার এবারের ঈদে নিজ কর্মস্থলেই ছিলেন। ঈদের আগে থেকেই সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াসহ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে কাজ করে চলেছেন। চুয়াডাঙ্গা কালেক্টরেট জামে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন তিনি। নামাজ শেষে চুয়াডাঙ্গা কালেক্টরেটের অফিসার্স কোয়াটারে হোম আইসোলেশনে থাকা চারজন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে ঈদ উপহার নিয়ে দেখা করেন। এরপর পরিবারের সঙ্গে সরকারি বাসভবনেই ঈদ উদ্যাপন করেছেন তিনি। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ঈদের দিনও কাজের চাপ ছিল। কাজের ফাঁকে সামাজিক ও শারীরিক দূরুত্ব বজায় রেখে কালেক্টরেটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছাবিনিময়সহ সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ফেসবুক ও মুঠোফোনের মাধ্যমে ঈদ শুভেচ্ছাবিনিময় করেছেন তিনি। জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে এবারের ঈদ নিরানন্দ। এমনিতেই ঈদে আমাদেরকে নিজ কর্মস্থলেই থাকতে হয়। তবুও এই ঈদটি এবার নিরানন্দ ছিল।’ তিনি আরও বলেন, প্রতিনিয়তই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদেরকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।’
এদিকে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সামনের সারিতে থেকে লড়াই করে চলেছেন চিকিৎসকেরা। দেশের প্রথম করোনাযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুবরণও করেছেন চিকিৎসকদের একজন। পরিবার-পরিজনের মায়া দূরে ঠেলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে করোনা রোগীদের সেবায় চিকিৎসকদের এই ত্যাগ মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে চলা এই করোনাযুদ্ধের শেষ কোথায় তা জানে না কেউ। কবে আবার সব আগের মতো স্বাভাবিক হবে, কবে জমবে মিলনমেলা, সেই অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে কেটে গেল ঈদুল ফিতর। বিশেষ করে এবারের ঈদের দিনটা অন্যরকম চিকিৎসকদের কাছে। খুবই অপরিচিত এক ঈদ। স্বজনদের দূরে রেখেই ঈদের দিনটি কেটেছে অনেক চিকিৎসকের।
করোনাভাইরাসের কারণে পুলিশ প্রশাসনের কাজ বেড়েছে প্রথম থেকেই। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম প্রথম থেকেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক কাজ করছেন। তিনি লকডাউনে ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়াসহ পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঈদ উপহার দিয়েছেন অসহায় ও কর্মহীন মানুষদের। ঈদের দিন সকালে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে পুলিশ লাইনস মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন। এরপর তাদের সঙ্গেই ঈদ উপলক্ষে সামাজিক ও শারীরিক দূরুত্ব বজায় রেখে বড় খানায় অংশ নেন। পরবর্তী সময় চার থানা, বিভিন্ন ক্যাম্পে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ফেসবুক ও মুঠোফোনের মাধ্যমে ঈদ শুভেচ্ছাবিনিময় করেন তিনি। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বাংলোতে শুভেচ্ছাবিনিময় এবং এক সঙ্গে খাওয়ার ইচ্ছা ছিল। তবে এবার করোনাভাইরাসের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। কাজের মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসানের ওপর অনেক দায়িত্ব। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি রাত-দিন কাজ করে চলেছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি এবার নিজ কর্মস্থলেই ঈদ উদ্যাপন করেছেন। চুয়াডাঙ্গা সমবায় নিউ মার্কেট জামে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় শেষে নিজ অফিস এবং সদর হাসপাতালে কর্মকর্ত-কর্মচারীসহ ভর্তি থাকা রোগীদের সঙ্গে সামাজিক ও শারীরিক দূরুত্ব বজায় রেখে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। তিনি বলেন, ‘এবারের ঈদটা যেমনই কাটুট, সামনে বার যেন ভালো কাটে, সে জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মসজিদে নামাজ পড়লেও অনেকে শারীরিক দূরুত্ব মানছেন না। আবার মাস্ক বাদেও দেখা যাচ্ছে। আমাদের সচেতন হতে হবে।’
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসাসেবায় ফ্রন্টলাইনে থেকে কাজ করছেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎিসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শামীম কবির। তিনি জেলা করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধবিষয়ক কমিটির অন্যতম সদস্য। ডা. শামীম কবির জানান, এবারের ঈদ অন্য ঈদের মতো নয়। আইসোলেশনে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্সরা ঈদ কাটিয়েছেন করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে। ঈদের দিন হাসপাতালের সব রোগীদের জন্য উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা ছিল। সকালে সেমাই, দুপুরে খাশির মাংশ, পোলাও, দই ইত্যাদি। জেলায় এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে স্বজনদের মধ্যে ফিরেছেন ৩২ জন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন একজন। এছাড়া বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন ও হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন অন্য ৫৩ জন রয়েছেন সুস্থ হওয়ার পথে।
পরিবার থেকে দূরে থেকে ঈদের দিন আইসোলেসন ইউনিটে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. নাজরিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন করোনা রোগীদের চিকিৎসায় আইসোলেসনে ডিউটি করেছি। আমাদের স্বজন এবং বন্ধুরা যখন তাদের আনন্দঘন মুহূর্তের ছবি ফেসবুকে শেয়ার করবেন, সে সব ছবি দেখে পরিবারের সদস্যদের কথা ভেবে হলেও মনটা খারাপ হবে। তারপরও এসব মেনে নিয়েই আমরা আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ও সন্ধিগ্ধ রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে যাব।’
ঈদের দিন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেসন ইউনিটে ডিউটি করেছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স তৃষ্ণা মণি ও রেবা খাতুন। পরিবারের সঙ্গে এবার আর তাঁদের ঈদ করা হয়নি। তবুও মানুষের সেবা দিতে দিতে তাঁরা হাসিমুখেই ঈদ পার করেছেন। তাঁরা বলেন, ‘এবারের ঈদে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারিনি। বাসায় ছোট বাচ্চা আছে, ওদেরকেও সময় দিতে পারছি না। একজন মা হিসেবে এই খারাপ লাগাটা কখনো বলে বোঝানো যাবে না। এতসব খারাপ লাগার মধ্যেও, ভালো লাগছে এই ভেবে যে, আমরা দেশের মানুষের সেবায় একটু হলেও অবদান রাখতে পারছি। আমাদের এই ত্যাগের মাধ্যমে হলেও একের পর এক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত মানুষ ও তার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারছি। এবারের ঈদে আমাদের কাছে এটাই সবথেকে বড় প্রাপ্তি।’
এদিকে, করোনাভাইরাস প্রমাণ করল সবার জন্য উন্মুক্ত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এটা দেখিয়ে দিয়েছে জিন ম্যাপিং, ভ্যাকসিন তৈরি আর বিজ্ঞানের গুরুত্ব কতটুকু। তবে, করোনা মহামারিতে এতসব কিছুর মধ্যে প্রমাণিত হলো সাংবাদিকতা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ প্রাদুর্ভাবের সময় যদি সাংবাদিকেরা না থাকতেন, তাহলে আরও বহু মানুষের মৃত্যু হত। সাংবাদিকেরা রোদ-বৃষ্টি, হুমকি উপেক্ষা করে সংবাদ তুলে ধরেন। যেখানে ছিল মৃতের সংবাদ, আপনজন হারানোর সংবাদ, চিকিৎসকদের ত্যাগ, রোগীদের অবস্থা, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ, রোগ নিয়ে গবেষণা, অসহায়দেরকে সহায়তা ইত্যাদি সংবাদ।
সাংবাদিকেরা যে সংবাদ প্রকাশ করেন, তা প্রথমে তারাই বিশ্বাস করে নেন না। তারা এটা তদন্ত করেন, নিশ্চিত হয়েই খবর তৈরি করেন। এরপর তা দ্বিতীয়, তৃতীয়বার পর্যন্ত সম্পাদনা করা হয়। চুয়াডাঙ্গার সাংবাদিকেরাও করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে। এবারের তাঁদের ঈদও ভালো কাটেনি। ঈদের দিনও ছুটতে হয়েছে নিউজে। নিজের এবং নিজের পরিবারের নিরাপত্তার থেকেও সংবাদ তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের সেবা করে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ ও সাংবাদিকেরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে চলেছেন। ঈদ হয়নি কারো। তবুও মনে দুঃখ নেই। করোনা মোকাবিলার সামনের সারির যোদ্ধা তাঁরা। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা নিয়ে ফ্রন্টলাইনে থেকে কাজ করছেন তাঁরা। করোনার এই সংকট এক দিন কেটে যাবে। তবে সামনের সারির এই যোদ্ধাদের ভুলবে না মানুষ।
