ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
রমজানের অর্ধেক পার হয়েছে। আর কিছুদিন পরেই ঘরে ঘরে আসছে ঈদ। কিন্তু করোনার কারণে এবার ঈদের আনন্দও ফিকে হতে চলেছে। ঈদ-উল-ফিতরের উৎসব এবার আর আগের বছরের মতো হবে না। ঈদের নামাজ আদায়, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, নানা ধরনের আয়োজন সবকিছুই এবার ভাটা পড়তে চলেছে। করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে সারাদেশে চলছে লকডাউন। মানুষ ঘরবন্দী হয়েই রোজা পালন করছে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই। ফলে অন্যবারের ন্যায় এবার ঘরে ফেরারও কোন আনন্দ নেই। যে যে অবস্থানে রয়েছে সেখানেই ঈদ পালন করতে হবে। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে থেকেও এবার বঞ্চিত হতে হবে। মার্চ থেকে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে সব কিছুই এখন স্থবির। দীর্ঘ ২ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। সরকার কয়েক দফা ছুটি বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। ঈদে ঘরে ফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রতি বছর ঈদ এলেই প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেতে লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে চলে যেত। পথে যানজটে ভোগান্তি থাকলেও ঘরে ফেরার আনন্দ ছিল অন্যরকম। এবার সেই আনন্দও অনুভূতি করোনার প্রকোপে ফিকে হতে চলেছে।
গণপরিবহনগুলোতে এবার নেই সেই অগ্রিম টিকেট বিক্রি। রাজধানীর সব বাসকাউন্টার এখন ফাকা। অগ্রিম টিকেট কাটার তাড়া নেই কারও মধ্যে। করোনার কারণে ট্রেন চলছে না। ফলে কমলাপুর রেল স্টেশনের রাত জেগে টিকেট সংগ্রহ করার সেই দৃশ্যও এবাব নেই। রাজধানীর মিরপুরের এক বাসিন্দা বলেন ঈদ এলেই বাড়ির ফেরার অগ্রিম টিকেট কেনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। ঘণ্টারপর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে একটি টিকেট পেলে মনে হতো সোনার হরিণ পেয়েছি। শত ভোগান্তি হলেও এই ভোগান্তির মধ্যে এক ধরনের আনন্দ উপভোগের বিষয় ছিল। কিন্তু করোনা এবার সব খেয়ে ফেলেছে। জীবনকে যেমন ঘরবন্দী করে ফেলেছে তেমনি প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আনন্দকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে। কতদিন যে এই অবস্থার মধ্যে থাকতে হয় তা বেভেই এখন অস্থির হতে হচ্ছে। শুধু ঘরে ফেরার আনন্দ নয়, এবার ঈদ কোনাকাটর আনন্দও মাটি করে দিয়েছে করোনা। প্রতিবছর ১০ রমজান পার হলেও মার্কেটগুলোতে জনসমাগমে ভরপুর থাকত। এখন মার্কেটগুলোর অবস্থা দেখলে মনে হয় বিরান ভূমি। কোথাও কেউ নেই। সরকার ঈদকে সামনে রেখে স্বাস্থবিধি মেনে কেনাকাটার জন্য মার্কেট খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু নিউমার্কেটসহ দেশের বড় বড় শপিংমল পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্ধ রেখেছে। তারা বলছেন এই মুহূর্তে মার্কেট খুলতে ক্রেতা পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া ঈদকে সামনে রেখে যেসব পণ্যের অর্ডার করা ছিল তাও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আবার স্বাস্থবিধি মেনেই কেনাকাটা করা কঠিন। শেষ সময়ে মার্কেট খুলতেও শ্রমিকদের বেতন বোনাসসহ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া কঠিন। সব বিবেচনায় সবকার সীমিত পরিসরে অনুমতি দিলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্কেট খোলা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও সীমিত পরিসরে কিছু দোকানপাট খূলছে রবিবার খেকে। এর মধ্যে আড়ং রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে ৪শ’ কোটি টাকার বিক্রির পরিকল্পনা থাকে তাদের। এবারও এই ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে তার চারভাগের এক ভাগ বিক্রি করা সম্ভব হবে না। এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে রাজধানীর অধিকাংশ শপিংমল বন্ধ রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান খুলেছে সেখানেও ক্রেতা সমাগম কম হচ্ছে। তবে অনলাইন কেনাকাটার এই মুহূর্তে কেশি বলে জানা গেছে। লোকেরা নিজে বাইরে না গিয়ে ই কমার্সের মাধ্যমে এবার কিছু কেনাকাটা করছেন। এর বাইরে লোকজন মার্কেটগুলোতে কমই ভিড় করছেন।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঈদ জামাতে আয়োজনেরও প্রস্তুতি থাকত আগেই। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত ঈদের নামাজ কিভাবে আদায় করা হবে সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন ঘোষণা আসেনি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়গুলোর একটি হিসেবে বিশেষজ্ঞরা যে বিষয়টির দিকে সবাইকেই খেয়াল রাখতে বলছেন, তা-হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, অর্থাৎ অন্যদের কাছ থেকে শারীরিকভাবে খানিকটা দূরে থাকা। কিন্তু এবার ঈদের নামাজ আদায় করতে হলে অবশ্যই সামাজিক এই দূরত্ব মানা সম্ভব হবে না। তাই এবার ঈদ জামাতের প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। প্রতি বছর ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহায় প্রধান ঈদের জামাত হতো হাইকোট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠে। এ ছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হতো। রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনে মিলে ঈদের প্রায় ৪শ’ জামাত প্রস্তুত করা হতো। এবার ঈদের জামাতের প্রস্তুতিও ফিকে হয়ে গেছে। কোথাও নেই সেই আয়োজন।
করোনার কারণে গত এক মাস বন্ধ ধরে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের ওপর সরকারে গাইডলাইন অনুযায়ী পরিচালিত হতো। কিন্তু আলেম সমাজের অনুরোধের পেক্ষিতে সম্প্রতি সরকার মসজিদে নামাজ আদায়ের ওপর থেকে সেই বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। এর পরিবর্তে ১২ দফা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নামাজ আদায়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একমাস বন্ধ থাকার পর রমজানের দ্বিতীয় শুক্রবার থেকে জুমার নামাজ আদায় শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে জুমার নামাজ ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আদায় করতে হয়েছে। এ ছাড়াও মসজিদে একইভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এভাবেই আদায় করা হচ্ছে। এ কারণে এবার ঈদ-উল-ফিতরের উৎসবও আগের বছরগুলোর মতো হবে না। করোনার পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে ঈদ-উল-ফিতরেও লোকজনকে বাড়িতেই অবস্থান করতে হবে। এমনকি ঈদের নামাজ আদায়, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, নানা ধরনের আয়োজন সবকিছুই ভাটা পড়ে যাবে। যেখানে থাকবে না প্রিয়জনের সান্নিধ্য। তবে বিকল্প পন্থায় সামাজিক যোগাযোর মাধ্যম ব্যবহার করেই প্রিয়জনদের সঙ্গে সেই যোগাযোগের রাস্তা তো তৈরি কিছুটা হলে সেই অনুভূতি তৈরি হবে।
