ছবির ক্যাপশন:
অনির্বাণ-এর তিন যুগপূর্তি উৎসব, নাটক ‘জিষ্ণ যারা’ মঞ্চায়িত
সাজ্জাদ হোসেন:
দর্শনায় চলছে ‘গাহি সাম্যের গান-/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান’ শীর্ষক স্থানীয় ডাকবাংলো চত্বরে আট দিনব্যাপী ‘অনির্বাণ-এর তিন যুগপূর্তি উৎসব। গতকাল শনিবার ছিল এই বর্ণাঢ্য কর্মযজ্ঞের দ্বিতীয় দিন এবং নাট্য উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী আসর। সন্ধ্যায় উৎসব মঞ্চে পঞ্চপ্রদীপ জালিয়ে শুভ সূচনা করেন দেশবরেণ্য নাট্যজন মাসুম রেজা। অনির্বাণ থিয়েটারের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মো. আলী আজগার টগর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন, অভিনেতা কামাল আহমেদ এবং পশ্চিম বাংলার বরেণ্য বাচিক শিল্পী সৌমিত্র ঘোষ।
উদ্বোধনী আসরে নাট্যজন মাসুম রেজা বলেন, ‘বর্তমান নাগরিক সমাজে একজন শিশুর পিতা-মাতা তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে যতটা যত্নবান লেখাপড়া নিয়ে, তার বিপরীতে ততটা অনিহা সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে নিজের সন্তানকে যুক্ত করতে। ফলে সন্তান হয়তো মানুষ হচ্ছে, কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠছে না। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবার মতো সময় দিচ্ছে না। ফলে এক সময় এরাই জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদে নাম লেখাচ্ছে, নিজের জীবন ও পবিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে’।
এর আগে বিকেলে উৎসব মঞ্চে পরিবেশিত হয় পূর্ব রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সন্ধ্যায় নাট্য উৎসবের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চায়িত হয় নাট্যজন আনোয়ার হোসেনের রচনা, নির্দেশনা ও মঞ্চপরিকল্পনায় অনির্বাণ থিয়েটারের মঞ্চসফল নাটক ‘জিষ্ণু যারা’। নাটক শুরু হয় মহিষের গায়ের মতো কালো কুচকুচে রাতে ঘটে যাওয়া একটি নারকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। খুন হয় মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ মাঝির বিধবা কন্যা ফুলি। মানুষ সন্দেহের আঙুল তোলে দেশদ্রোহী এক রাজাকার পরিবারের দিকে। ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে থানায় মামলা দায়ের করেন ফুলির বাবা। পুলিশ রাজনৈতিক ডামাডোলে মামলাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করে। নিজ ছেলেকে রক্ষার চেষ্টায় ধুর্ত খন্দকার বিষয়টি লোক চক্ষুর আড়ালে নেবার জন্য এবং মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরাবার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে উপলক্ষ্য করে, তার পক্ষের একজন চেয়ারম্যানকে পুনরায় নির্বাচনে জেতাবার নিশ্চয়তায় সরকারের একজন মন্ত্রীকে গ্রামে নিয়ে আসেন। গ্রামে মন্ত্রী আগমনের খবরে মানুষের উৎফুল্লতায় ফুলি হত্যার ঘটনা চাপা পড়ে যায়। স্বার্থের প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের সহাবস্থান একাকার হয়ে যায়। তারপরও কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করেই আপসহীনভাবে জীবনযাপন করে টিকে থাকে। দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধার কন্যার প্রতি নিষ্ঠুরতা, তাকে হত্যা করার সব আলামত দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ, অথচ ক্ষমতা বলয়ের কাছে তারা পরাজিত। এমন পরিস্থিতিতে ফুলির অত্যন্ত স্নেহের যাত্রাশিল্পী এক যুবক জনসমুখ্যে এর শোধ নেবার পরিকল্পনা আটে। খন্দকার বাড়ির চৌহদ্দিতে যাত্রাগানের আয়োজন করে এবং যাত্রার মঞ্চেই ধর্ষক ও হত্যাকারী খন্দকারের বখাটে ছেলের মস্তক শিরচ্ছেদ করে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়।
নাটকটিতে অভিনয় করেছেন খাইরুল ইসলাম, আব্দুর রহমান, মাহাবুবুর রহমান মুকুল, ফেরদৌসী পারভনি পপি, আসমা হেনা চুমকি, শামীম আজাদ, মিরাজ উদ্দিন, হাসমত কবির, সাজ্জাদ হোসেন, জগন্নাথ কুমার কর্মকার, আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল তপু, এস এম সাব্বির আলিম, ফরহাদ হোসেন টিটন, হাবিবুর রহমান ঈদু ও শাহিনা আসাদ। আর নেপথ্যে কাজ করেছেন আবহ সংগীত- ইসরাইল হোসেন খান টিটো, আলোক পরিকল্পনা- আবুল হোসেন, আলোক নিয়ন্ত্রণ- রেজাউল করিম, আলোক সরবারহ- জীবন কৃষ্ণ সাহা, পোষাক পরিকল্পনা- সাকি এনাম তারা, উপকরণ- মিরাজ উদ্দিন, বাদ্যযন্ত্রী- ইসরাইল হোসেন খান টিটো, সায়েমুল হক টিপু, মামুন আল রাজী, আব্দুর রহমান ও খাইরুল ইসলাম। প্রযোজনা ও ব্যবস্থপনা : সায়েমুল হক টিপু।
আজ বিকেলে উৎসব মঞ্চে থাকছে কেরু উচ্চবিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া শিল্পীদের লালন সংগীত এবং সবশেষে পশ্চিম বাংলার অঙ্গন বেলঘরিয়ায় নাটক টম অ্যান্ড জেরি। উল্লেখ্য, এবারের উৎসব রাজনীতির কবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উৎসর্গ করা হয়েছে। উৎসবটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাব লিমিটেড।
