ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে চলছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, বাড়ছে শীতজনিত রোগ
মেহেরাব্বিন সানভী/রুদ্র রাসেল:
চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে মৃদু ও মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে চলছে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যেমন বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, তেমনই চরম বিপাকে ও ভোগান্তিতে পড়েছেন দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো।
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতলে জরুরি বিভাগ, অন্তবিভাগ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৫ শ’র অধিক রোগী। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। গত এক সপ্তাহে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১১ জনসহ ৪৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১১২ জন শিশু, ১৭ জন পুরুষ, ৮৩ নারীসহ ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ২১২ জন। জ্বর, সর্দি-কাশি, হাইপার টেনশন, শ্বাসকষ্ট, পেটের পীড়াসহ সাত দিনে হাসপাতলের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ২২ জন ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন আরও ১৪ জন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৬৭ জন। এ ছাড়াও জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ থেকে প্রতিদিন গড়ে শিশুসহ চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৫০ জনের অধিক রোগী। তবে হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সংকট যাচ্ছে কলেরা স্যালাইনের। গত দুই দিন ধরে হাসপাতাল থেকে কলেরা স্যালাইন পাচ্ছে না ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা। খাবার স্যালাইন পর্যাপ্ত পরিমানে থাকলেও কলেরা স্যালাইন না থাকায় বাইরে থেকে কলেরা স্যালাইন কিনতে হচ্ছে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রিমা সুলতানা জানান, ‘তীব্র ঠাণ্ডায় শীতের পোশাক পরেও শীত কমেনি, সকালে উঠে কাজ করতে হয়। ঠাণ্ডার মধ্যে বাসার কাজ করতে যেয়েই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতলে ভর্তি হয়েছি। হাসপাতলে রোগীর সংখ্যা কম, সকালে ভর্তি হয়ে রাতেই বিছানা পেয়েছি।’ জীবন বিশ্বাস নামের এক রোগী বলেন, ‘দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষ আমি, কৃষি কাজ করি। রোজ ভোরেই উঠে মাঠে যেতে হয়। মঙ্গলবার ভোরে শীতের মধ্যে মাঠে কাজ করতে যেয়ে ঠাণ্ডার শিকার হয়েছি। গতকাল রাতে হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছি।’
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শামীম কবির জানান, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইপার টেনশন, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, পেটের পীড়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। শীতের তীব্রতা বাড়ায় শীতজনিত রোগের শিকার বেশি হয়েছে শিশুরা।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান জানান, শীত বাড়লেই শীতজনিত রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। শীতজজনিত রোগে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়।
অপর দিকে, এদিকে, সাধারণ মানুষ তুলনামূলক ঘর থেকে কম বের হওয়ায় কাক্সিক্ষত কাজ পাচ্ছেন না শ্রমজীবী মানুষ। কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে অনেকের। স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে ব্যহত হচ্ছেন তাঁরা। এতে করে তাঁদের দুমুঠো আহার যোগানো এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কাজের সন্ধানে সূর্যোদয়ের আগেই শহরের শহীদ হাসান চত্বর এলাকায় আসা চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হানুরবাড়াদি গ্রামের দিনমজুর ষাটোর্দ্ধ মওলা বকসো বলেন, ‘সেই সাত সক্কালে চুয়োডাঙায় আইসে কাজের জন্যি বইসে আছি। সকাল থেকে একটা গৃহস্তও চোখে দেকলাম না। জন হিসেবে কাজে লাগাবে, এমন কেউ আইসে খোঁজ করল না। বেলা হয়ে গেল তাই কাজ না পাইয়ে বাড়ি চইলে যাচ্ছি।’ গত চার দিন ধরে কাক্সিক্ষত কাজ না পাওয়ায় ক্ষোভে এ কথাগুলো তিনি বলেন। কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন শীতের তীব্রতাকে।
সাধারণ মানুষ তুলনামুলক ঘর থেকে কম বের হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁর মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। শুধু মওলা বকসো নয়, এ রকম আরও শতাধিক দিনমজুর প্রতিদিনই সুর্যোদয়ের আগেই এসে জড়ো হন শহরের শহীদ হাসান চত্বর এলাকায়। সেখান থেকেই একে একে বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে পড়েন তাঁরা। তবে গত কয়েকদিন ধরে শীতের তীব্রতার কারণে সেই ধারাবাহিকতার ছন্দপতন ঘটেছে। কাজের সন্ধানে এসে কাজ না পেয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে বাড়িতে।
দৈনিক চুক্তিতে শ্রম বেঁচা আরেক শ্রমিক আবুল কাশেম জানান, কাজের সন্ধানে এসে কাজ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন বাড়িতে। তাঁরা দিন এনে দিন খান। তাই একদিন কাজ না পেলে বাড়িতে চুলা জ্বলে না। ফলে স্ত্রী সন্তান নিয়ে দুই বেলা আহার যোগানো এখন কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এরকম পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যহত থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে চুয়াডাঙ্গা আবহওয়া অফিস। একই সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গার আকাশ মেঘলা থাকার সাথে হালকা বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
