ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটিসহ স্বাধীনতাবিরোধীনদের ১০ হাজার ৭৮৯ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা যেমন স্থান পেয়েছে তেমনি রাষ্ট্র স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এমন সেক্টর কমান্ডের শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের নামও এসেছে। বিজয়ের ৪৮ বছর পর ঘোষিত রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। স্বাধীনতার মাসে এমন ধৃষ্টতার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে। যদিও মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক দাবি করেছেন-তালিকা তারা প্রকাশ করেছেন, সরবরাহ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজাকারের তালিকায় রাজাকার বাদ পড়ছে, মুক্তিযোদ্ধা ও বীর সংগঠকদের নাম আসছে। এ পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। গত ১৫ ডিসেম্বর রোববার সরকারি নথির তথ্য-উপাত্যের ভিত্তিতে নিজ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তালিকাটি প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। এ সময় মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী দীর্ঘ নয় মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। তিনি বলেন, একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরানো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিলো সেটুকু প্রকাশ করছি। এরপরও যেসব দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই নাম প্রকাশ করা হবে। কোনো তালিকা শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে প্রকাশ করা হবে না। অন্যায়ভাবে কেউ তালিকাভুক্ত হবে না। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পরপরই সারা দেশে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। প্রকাশিত তালিকায় দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাপরাধী বিচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।
তথ্য মতে, রাজাকার হিসেবে উঠে এসেছে রাজশাহী বিভাগের ৮৯ নম্বর তালিকায় (ক্রমিক নম্বর ৬০৬) আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর, মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুসহ ৫ জনের নাম। অথচ এই পাঁচজন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট মহসিন আলীর নামও রয়েছে তালিকায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় অ্যাড. আবদুস সালামের পরিবারের ৫ সদস্য নিহত হন। তার নামটিও রয়েছে রাজাকারের তালিকায়। এ ছাড়া তালিকায় আছে রাজশাহীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবদুর রউফ ও পুলিশ কর্মকর্তা এসএস আবু তালেব।
এ ঘটনায় হতবাক ও মর্মাহত হয়েছেন প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম না এ শক্তিটা তারা কোথা থেকে পেলেন।’ মুক্তিযোদ্ধা সংস্থা বা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সেখানে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে শক্তির অবস্থান কিছুটা রয়ে গেছে। আর সেখান থেকেই এ অবস্থা হচ্ছে যা উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে। এসময় রাজাকারের তালিকা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ওয়ালিউর রহমান বাবু বলেন, তালিকায় রাজশাহীর অন্যতম রাজাকার তৎকালীন জামায়াতের আমীর অ্যাডভোকেট আফাজ উদ্দিন, শান্তি কমিটির সভাপতি সাবেক এমপি আয়েন উদ্দিন এবং ওয়াহেদ আলী মোল্লার নাম নেই। অথচ এই তিনজনই রাজশাহীর রাজাকারদের শীর্ষস্থানীয়। তাদের নাম এ তালিকায় না থাকা খুবই দুঃখজনক। অন্যদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাদের নাম তালিকায় আসাটা চরম লজ্জার।
রাজাকারের তালিকায় নাম এসেছে গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার ও তার মা ঊষা রানী দেবীর নাম। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তপন কুমারের মেয়ে ও বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, বরিশালে আমার বাবা একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। এছাড়া আমার দাদু মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী যার ক্রমিক নম্বর ১১২, পৃষ্ঠা নম্বর ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পেয়ে থাকেন। শহীদ বিধবা যিনি, সারাজীবন এ শোক বয়ে বেড়িয়েছেন। রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দিলো রাজাকারের তালিকায় তার নামটি অন্তর্ভুক্ত করে। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবার জন্য ন্যকারজনক ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের ৭নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমন্ডার, সিরাজগঞ্জের পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের সর্বাধিনায়ক, দুবার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য মরহুম আব্দুল লতিফ মির্জার নামটাও এসেছে রাজাকারের তালিকায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রনি নিজের ফেসবুকে লিখেছেন— কারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চাকরি করার সুবাধে বাবা-শ্বশুরকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন? এদের ধরুন। বিচার করুন। যারা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এমন অপমান করলো, তাদের শাস্তির আওতায় আনুন। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের হূদয়ের রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের সহ-সর্বাধিনায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন বলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং একসাথে যুদ্ধ করেছি। সেই মহান নেতাকে আজ রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। এই তালিকা প্রত্যাহার করতে হবে। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জন ম্লান করে দেয়ার জন্য উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। রাজাকারের তালিকায় নাম এসেছে একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত সাংবাদিক তিমির লাল দত্তর। অথচ তিমির দত্তর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তিনি একাই মুক্তিযুদ্ধে যাননি; তাঁর বাবা জীতেন্দ্রলাল দত্ত এবং মেঝভাই সুবীর লাল দত্ত মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তিমির লাল দত্তর মৃত্যুর পর ২০১৬ সালে জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর মরদেহে সরকারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার (রাষ্ট্রীয় সম্মান) প্রদান করা হয়। এ ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা তিমির লাল দত্তের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় ৩০ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম রয়েছে। এর মধ্যে রাজাকার নন এমন সাতজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তালিকার ১৮ নম্বরে রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি কছিম উদ্দিন আহম্মেদের নাম। ১৯ নম্বরে আওয়ামী লীগের সাবেক এমএলএ মজিবর রহমান (আক্কেলপুর), ৪ নম্বরে মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার মনছুর আলী, ৯ নম্বরে আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি তাহের উদ্দিন সরদার, ১৬ নম্বরে রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযোদ্ধা জাহান আলী, ৩ নম্বরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আমিরুল ইসলাম, ৭ নম্বরে আওয়ামী লীগ নেতা ফয়েজ উদ্দিন আহম্মেদসহ অনেকের নাম এসেছে। আদমদীঘি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল হামিদ জানান, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে রাজাকারের তালিকা করা হয়েছে। যারা আওয়ামী লীগের সংগঠক এবং যুদ্ধকালীন কমান্ডার তাদের নাম কীভাবে রাজাকারের তালিকায় এসেছে তা দেখে তারা হতবাক হয়েছেন। রাজাকার বানানোর সঙ্গে জড়িতদের বিচার করতে হবে।
প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি আলহাজ মজিবুল হকের নাম নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পাথরঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি আ. মন্নান হাওলাদার জানান, মজিবুল হক তার জীবন-যৌবন সব আওয়ামী লীগকে দান করে গেছেন। তিনি একসময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই মঞ্চে আ.লীগের রাজনীতি করতেন।
এদিকে, ঘোষিত তালিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বারষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমি যখন তালিকা প্রকাশ করি, তখন বারবার বলেছি, এ তালিকা আমরা প্রণয়ন করিনি, প্রকাশ করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরা যা পেয়েছি, তাই হুবহু প্রকাশ করেছি।’ একই দাবি করে গতকাল সন্ধ্যায় এক প্রেসবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। তবে একথা মানতে নারাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ প্রসঙ্গে বলেছেন- রাজাকারের তালিকায় থাকা কিছু নাম বাদ দিতে নোট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী তালিকা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় রাজাকারের লিস্ট করবে। আমাদের কাছে দাবি করে তারা চিঠি পাঠিয়েছিলেন, আমাদের কাছে যে সমস্ত তথ্য আছে সেগুলো যেনো পাঠানো হয়। রাজাকারের লিস্ট তৈরি করা দুরুহ ব্যাপার। আমরা প্রাথমিকভাবে দালাল আইনে যাদের নামে মামলা হয়েছিল, সেই দালাল আইনের লিস্টটা আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। সেই লিস্টে আমরা মন্তব্য করে দিয়েছি, অনেকের নামের মামলা উইথড্র করা হয়েছিলো। সেটা তালিকায় যাথাযথভাবে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের রাজাকারের তালিকা নিয়ে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত তালিকার ব্যর্থতার দায় মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। এ কাজে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিলো। তালিকাটি প্রকাশের আগে মন্ত্রণালয়ের ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা হলে অসঙ্গতিগুলো ধরা পড়ত। সেক্ষেত্রে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকত না। বিতর্কের পর রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। ভুলের পরিমাণ বেশি হলে পুরো তালিকা প্রত্যাহার করা হবে বলেও জানান তিনি। ঘোষিত তালিকার দায় মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে কি না জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এসএম আরিফ উর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
