ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রকাশিত প্রথম রাজাকারের তালিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি, ভাষাসৈনিক, ও গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেকের নাম রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় থাকলে তা যাচাই করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। প্রকাশিত তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপুসহ পাঁচজনের নাম রয়েছে। তালিকায় অ্যাডভোকেট মহসিন আলী, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম, তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবদুর রউফ ও পুলিশ কর্মকর্তা এসএস আবু তালেবের নাম রয়েছে। অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রভাষা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, রাজশাহীর যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আরিফ টিপুর বড় অবদান ছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫ সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি এছাড়া অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম ও অ্যাডভোকেট মহসিন আলী তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রকাশিত তালিকায় ৬৫ নম্বর রাজাকারের নাম অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্ত্তী। তিনি একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা। তার ক্রমিক নম্বর ১১২, পৃষ্ঠা ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও পেয়ে থাকেন। এছাড়া উষা রানী চক্রবর্ত্তীর নামও রয়েছে রাজাকারের তালিকায়। তিনিও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতেন।
তপন কুমার চক্রবর্ত্তীর মেয়ে ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, আমার ঠাকুরদা অ্যাডভোকেট সুধির কুমার চক্রবর্ত্তীকে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তার সহধর্মিণী আমার ঠাকুমা উষা রানী চক্রবর্ত্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রমজীবী খেটেখাওয়া মানুষদের জন্য আমার রাজনীতি করার খেসারত দিতে হচ্ছে আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে।
প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় নাম রয়েছে মরহুম মো. মজিবুল হকের। বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন তিনি। ছিলেন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতিও। তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম বলেন, বঙ্গবন্ধু আমার স্বামীর কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটতেন। শেখ হাসিনা আমার স্বামীর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেন। দূরে বসলে তাকে কাছে টেনে বসাতেন শেখ হাসিনা। সেই মানুষটা কি করে রাজাকার হলো, তা আমি জানতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি এর বিচার চাই। প্রকাশিত এই তালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর নামও রয়েছে। তারা বিএনপি আমলে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশ্য ’৭১ সালে তারা স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা বলছেন, প্রকাশিত রাজাকারের তালিকাটি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তালিকা প্রকাশের আগে মুক্তিযুদ্ধ বিশেষজ্ঞদেও মতামতও নেয়া হয়নি। তাই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের উচিত দ্রুতই তালিকাটি সংশোধন করা। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির সংবাদকে বলেন, আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে দেখছি। এক নামে দুই ব্যাক্তি থাকতে পারেন। ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি গোলাম আরিফ নামই যে উঠেছে, তা এখন বলা যাচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে ২০ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবো।
নারায়ণঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকা প্রকাশ হওয়ায় আমি বেশ খুশি। আমি চাই প্রকৃত রাজাকারের বিচার হোক। কিন্তু এই তালিকা বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদদ্ধাসহ রাজাকার নন এমন ব্যাক্তির নামও উঠে এসেছে। উদাহরন দিয়ে তিনি বলেন, প্রকাশিত তালিকায় সফর আলী ভূইয়া নামে একজনের নাম এসেছে। ’৭১ সালে তিনি মুনলাইট সিনেমা হলে চাকরি করতেন। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। হানাদাররা কাউকে নিয়ে গেলে সে তদবির করে ছাড়িয়ে। কিন্তু তাদের কোন কর্মকা-ে যুক্ত ছিলেন না। তার মতোই বাদসা মেম্বারের নামও এসেছে। কিন্তু তিনিও রাজাকার ছিলেন না। এই দু’জনের নাম তালিকায় আসায় নারায়ণগঞ্জে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আমরা চাই প্রকৃত রাজাকারের তালিকা হোক।
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, আমরা নিজেরা কোন তালিকা প্রস্তুত করিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা যে তালিকা করেছে, আমরা শুধু তা প্রকাশ করেছি। সেখানে কার নাম আছে, আর কার নাম নেই সেটা আমরা বলতে পারব না। একই নামে তো অনেক মানুষ থাকতে পারে। আর একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় আসবে কেন, এটা হতে পারে না। আর যদি আসেও সেটা পাক বাহিনীর ভুল। যদি মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় এসে থাকে, তবে আমরা সেটা যাচাই করে দেখব।
তালিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেন, আমি স্তম্ভিত, বিস্মিত। এ ধরনের কিছু কী করে ঘটে? রাজশাহীতে গোলাম আরিফ নামে আর কোন অ্যাডভোকেট আছে কি? অ্যাডভোকেট মহসীন, অ্যাডভোকেট সালামের নাম দেখেও আমি বিস্মিত। তবে এই তিনটি নামের পাশে বাবার নাম উল্লেখ নেই। রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধা তৈয়বুর রহমান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, অ্যাডভোকেট মহসিন আওয়ামী লীগের চিহ্নিত নেতা, তিনি ইয়েস ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। অ্যাডভোকেট সালাম, অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ, এরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। তাদের রাজনীতি জীবন সবার জানা। বাবার নাম উল্লেখ না থাকায় এটা আরও বেশি বিপদের হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
