খেলাপি ঋণ: ব্যাংক খাতে অশনি সংকেত

আপলোড তারিখঃ 2019-11-29 ইং
খেলাপি ঋণ: ব্যাংক খাতে অশনি সংকেত ছবির ক্যাপশন:
খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা : দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা সমীকরণ প্রতিবেদন: বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো হু-হু করে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও খেলাপিদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পরও আসছে না কোনো ইতিবাচক ফল। উল্টো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে খেলাপির পরিমাণ। এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১২ শতাংশই খেলাপি। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯৯ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যমান পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য ‘অশনি সংকেত’- এমন মন্তব্য করেছে বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ধারাবাহিকভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ সমস্যার সমাধানে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই জরুরি। অন্যথায় উচ্চ ঋণখেলাপির বেড়াজাল থেকে বের হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ধারাবাহিকভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য অ্যালার্মিং। সে কারণে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে অনেক আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। আইনগুলোকে কার্যকর করতে হবে। এসব কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব নয়। সর্বোপরি ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তা না হলে বারবার একই দৃশ্যের অবতারণা হবে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বাড়ছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যত নীতি সহায়তা দেয়া হয়েছে তার পুরোটাই খেলাপিদের পক্ষে, এখানে ভালো গ্রাহকদের জন্য কিছুই নেই। মূলত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব নয়। তার আগে নতুন খেলাপি বন্ধ করতে হবে। সেজন্য খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দীর্ঘ করা যাবে না। আর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বিশেষ করে রাঘববোয়ালদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে বাকিরা ভয় পাবে। এছাড়া অর্থঋণ আদালত, দেউলিয়া আইনসহ সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ভেঙেচুরে নতুন করে সাজাতে হবে। লোক দেখানো কিছু করা যাবে না। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ঋণ ছিল ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৭ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বরের তুলনায় বেড়েছে ৫৮ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এভাবে ধীরগতি থাকলেও খেলাপি ঋণ বাড়ছে ঠিকই লাগামহীনভাবে। দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো অর্থহীন। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পুরস্কৃত করা হচ্ছে। অন্যরাও এতে উৎসাহ পাচ্ছে। খেলাপিদের যদি ভালো গ্রাহকদের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি খারাপই হবে। এতে এক ধরনের ভুল বার্তা যাচ্ছে। যার কারণে কেউ টাকা পরিশোধ করছেন না। এছাড়া যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে ব্যাংকাররা খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপরতা দেখাচ্ছে না। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনি সংকেত। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কোনো কিছুকে উৎসাহিত করলে সেটা বেড়ে যায়। আর শাস্তি দিলে কমে যায়। এটাই চিরাচরিত নিয়ম। যে কারণে সারাবিশ্বে ঋণখেলাপিদের শাস্তির মাধ্যমে খেলাপি কমানো হয়। আমাদের দেশেও তাই ছিল। সরকার দুটি প্রক্রিয়ায় খেলাপিদের উৎসাহ দিয়েছে। প্রথমত, খেলাপি হওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। যেখানে সুদহার মাত্র ৯ শতাংশ। এসব কারণে নিয়মিত যারা টাকা পরিশোধ করতেন, তারা দেখছেন টাকা না দিলেই লাভ বেশি। ফলে কিস্তি না দিয়ে তারাও খেলাপি হয়েছেন। ফলে খেলাপি ঋণ না কমে বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গত ১৬ মে ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্দমানে খেলাপি হওয়া ঋণ মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট বা এককালীন জমা দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এই পুনঃতফসিল পাওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ সুদ নিতে পারবে ৯ শতাংশ। ব্যাংক চাইলে পুনঃতফসিলের আগে সুদ মওকুফ সুবিধা দিতে পারবে। ঋণখেলাপিদের জন্য এতসব সুবিধা দিয়ে গত মে মাসে সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ রকম নীতিমালার সমালোচনা করে আসছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত এক সেমিনারে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ বলেন, এভাবে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বিশেষ নীতিমালার আওতায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে আবেদন এসেছে পাঁচ হাজার ৪৬৩টি। এসব আবেদনের বিপরীতে ৪৫ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল চেয়েছেন খেলাপিরা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮০৩টি আবেদন নিষ্পত্তি করেছে ব্যাংকগুলো। যার বিপরীতে পুনঃতফসিল করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এর বাইরেও অনেক ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। গত সাড়ে ছয় বছরে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে ব্যাংকগুলো। আবার চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠনের ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে ব্যাংকিং খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। যদিও এর মধ্যে কিছু অংশ আদায় হয়েছে। ঋণখেলাপি, ঋণ অবলোপন, ঋণ পুনঃতফসিল এবং ঋণ পুনর্গঠনকে একসঙ্গে ‘স্ট্রেসড অ্যাসেট বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’ বলে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক আরও বেশি। তা কোনোভাবে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার কম হবে না।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)