ছবির ক্যাপশন:
জামায়াতের বিদ্রোহী দলে হেভিওয়েটদের জন্য অপেক্ষা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
জামায়াতের সাবেক সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বেই নতুন নাম নিয়ে পুরনো চেহারায় আসছে জামায়াত। যদিও গত এপ্রিলে রাজধানীর হোটেল ৭১-এ সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুর দাবি ছিলো জনআকাক্সক্ষা বাংলাদেশের সাথে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আবার পদত্যাগ করে ফেব্রুয়ারিতে রাজ্জাকও বলেছিলেন, তিনি নতুন কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। তবে সেই অবস্থান এখন আর নেই। আব্দুর রাজ্জাকই নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আসছেন। মজিবুর রহমান মঞ্জুকে দৃশ্যত রেখে কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে লন্ডন থেকে ইতিমধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলের ছক তিনি তৈরি করে রেখেছেন।
দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বিদ্রোহী নতুন দলটি এখন মাত্র ঘোষণার অপেক্ষায়। তার পরামর্শে ও নির্দেশনায় ইতোমধ্যে ৩০ জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। যদিও এর আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনমাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার আশ্বাস দিয়েছিলেন জনআকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের সমন্বয়ক মঞ্জু। সাত মাস অতিবাহিত হলেও এখনো দলটি কমিটি গঠন করতে পারেনি। কমিটিতে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব উঠে এলেও জামায়াতের হস্তক্ষেপের কারণে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব তৈরিতে বারবারই বাধাগ্রস্ত হয়। রাগে-ক্ষোভে দীর্ঘ দিন ধরে জামায়াতের কোনো কর্মসূচিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় শিবিরের সাথেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব রয়েছে। এ দূরত্বের ফসল জনআকাক্সক্ষায় নিতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পরামর্শে শক্তভাবে কাজ করছে বড় একটি অংশ। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বৈঠক হয়েছে কয়েকবার। ইতিমধ্যে দলটির রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট স্থানসহ যে কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছে এর সবকয়টি প্রোগ্রামেই ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি। কমিটি গঠনসহ আব্দুর রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাজ করছেন বেশ কয়েকজন। রয়েছেন কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সাবেক মেজরও। তবে জামায়াতের নতুন দলের গঠনতন্ত্র নিয়ে কাজ করছেন দলটির আইনজীবী তাজুল ইসলাম। আর প্রধান সমন্বয়ক মজিবুর রহমান মঞ্জুর সঙ্গে পরামর্শক হিসেবে রয়েছেন মেজর (অব.) আবদুল ওহাব মিনার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল কাদের, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ, অধ্যাপক আবদুল হক, গোলাম ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা নূর, নাজমুল হুদা অপু, মো. সালাউদ্দিন, ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, আবদুল হক, নুরুল ইসলাম ভূইয়া ছোটন, গৌতম দাশ, রুবী আমাতুল্লাহ, সুকৃতি কুমার ম-ল।
এছাড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবনার খসড়া কমিটি, জনসংযোগ ও অন্তর্ভুক্তি তত্ত্বাবধান, গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক, অর্থ সংগ্রহ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা এবং পরিকল্পনা, সাংগঠনিক কাঠামো, কর্মকৌশল এবং পরিকল্পনা কমিটি গঠন— এ বিষয়গুলোর রূপরেখাও দাঁড় করানো হচ্ছে। সবমিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ের দিকে রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে নতুন দল গঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম সংবাদ সম্মেলন করে জানানোর প্রস্তুতি রেখেছে দলটি। শুরু থেকেই দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, জামায়াতের নতুন নেতৃত্বের নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে। নেতৃত্ব কোন্দলে ভালো সময় যাচ্ছে না জামায়াতের।
জামায়াতের আমির মকবুল আহমেদকে দলের একটি অংশ গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছে, তিনি অসুস্থতার কারণে ছুটি চেয়েছেন। তাই নতুন নেতৃত্বের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আরেকটি অংশের ক্ষোভ তিনি যদি ছুটি চান তাহলে এখন পর্যন্ত কারণ জানিয়ে চিঠি ইস্যু করা হয়নি কেন? এর আগে জামায়াত থেকে বিদায় নেয়ার আগে দলটির সাবেক আমির গোলাম আযম চিঠি ইস্যু করেই বিদায় নেন। এ নিয়ে দলের ভেতরে বড় একটি অংশের ক্ষোভ রয়েছে। তিনি কী আদৌ বিদায় নিচ্ছেন নাকি বিদায় দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দলটির আমির নির্বাচন নিয়েও ভেতরে ভেতরে বড় কোন্দল চলছে। ডিসেম্বরের শুরুতে জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল ঘোষণা হলে হেভিওয়েট পাঁচ-ছয়জন দলটি থেকে পদত্যাগ করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে একজন জামায়াত ত্যাগ করে জনআকাক্সক্ষায় যোগ দিলে তিনিই আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে হতে পারেন সেক্রেটারি।
এছাড়া বিএনপি থেকেও হেভিওয়েট বেশ কয়েকজন আসতে পারে। এদের মধ্যে দুজন রয়েছে, তাদের একজন যদি আসেন তাহলে তাকে জনআকাক্সক্ষার সভাপতি করে ব্যারিস্টার রাজ্জাককে প্রধান উপদেষ্টার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। তবে খুব শিগগিরই বিএনপির বেশ কয়েকজন আবদুর রাজ্জাকের দলে আসতে পারেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, মজিবুর রহমান মঞ্জু নানানভাবে যোগাযোগ করছেন। হেভিওয়েট কয়েকজন আশার ইঙ্গিতও পেয়েছেন। তাই তিন মাসের মধ্যে কমিটি গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন তারা।
এ নিয়ে মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘আমরা বলেছি সাম্য মানবিক এবং ইনসাফভিত্তিক দল পরিচালনা করা। যেটা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে রয়েছে। সেই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা নতুন দল ঘোষণা করছি। এখন পর্যন্ত আমাদের সাথে বিএনপির অনেকে সাড়া দিয়েছেন। অনেকে আমাদের সাথে এসে কথা বলেছেন। আমরাও নিজ দায়িত্বে অনেকের সাথে গিয়ে কথা বলেছি।’ আওয়ামী লীগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেহেতু এখন সরকারি দল এদের মধ্যে যারা পজিটিভভাবে রাজনীতি করেন, যারা দেশকে ভালোবাসেন, চিন্তা করেন, তাদের অনেকেই মনে করছেন বর্তমানে আওয়ামী লীগ অগণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। যাদের কাছে আ.লীগের চলমান কর্মকা- ভালো লাগছে না, তারাও আমাদের সাথে কথা বলছেন, আমাদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন। আমরাও কারো কারো সাথে কথা বলেছি।’
জামায়াতের আইনজীবী ও জনআকাক্সক্ষার সমন্বয়ক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কোনো দল থেকে বেরিয়ে আসিনি। আমরা একটা উদ্দেশ্য নিয়েই এগোচ্ছি। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দলের অনেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। এখন পর্যন্ত যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হননি এমন একটি সংখ্যা আমাদের সাথে সংযুক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন। আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকবে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা।
