প্রচারহীন আইন কার্যকরে দুর্বলতা

আপলোড তারিখঃ 2019-11-02 ইং
প্রচারহীন আইন কার্যকরে দুর্বলতা ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন: সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকরের মধ্য দিয়ে অকার্যকর হচ্ছে মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩ এবং মোটরযান বিধিমালা-১৯৮৪ এর অধীন সড়ক পরিবহন খাতের আইন ও বিধি। যদিও জনসচেতনতামূলক প্রচারণা না চালিয়েই নতুন এ আইন কার্যকরে দেখা দিয়েছে নানা বিতর্ক। নতুন এ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রচারহীনতাকে দুর্বলতা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার কার্যকরের প্রথম দিনেই নতুন আইন বাদ দিয়ে চলছে পুরনো আইনের প্রয়োগ। নতুন আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকলেও সর্বনি¤œ শাস্তির উল্লেখ নেই। আবার জামিনঅযোগ্য নতুন আইনে রয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সাজার বিধানও। এরই মধ্য দিয়ে চালক-মালিকদের সতর্ক হওয়ার সময়ও এসেছে এবার। সড়ক আইন লঙ্ঘন করলেই গুনতে হবে মোটা অঙ্কের জরিমানা, কারাদ- এমনকি উভয় দ-। জরিমানাও হতে পারে পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে নতুন এই আইনের বিধি এখনো তৈরি করতে পারেনি সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। খসড়া বিধিতেই চলছে ঘষামাজা। নতুন আইন, বিপুল পরিবর্তন সত্ত্বেও তা জনগণ ও পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের জানাতে সরকারের তেমন একটা তৎপরতা দেখা যায়নি। সচেতনতামূলক কর্মসূচিও দেখা যায়নি কার্যকরের আগে গত এক বছরেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন আইনে বেশির ভাগ ধারায় জরিমানা ১০ থেকে ৫০ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিছু কিছু ধারায় যা এক হাজার গুণও বেড়েছে। আগে যেসব ধারায় তিন মাস কারাদ-ের বিধান ছিলো, তা এখন তিন বছর পর্যন্ত হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি উল্লেখ করা হলেও সর্বনি¤œ শাস্তির উল্লেখ নেই তাতে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নির্বাহী হাকিমরা সড়কে কোন অপরাধের জন্য কী পরিমাণ জরিমানা করবেন এ নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা একই অপরাধে করতে পারেন একেক পরিমাণ জরিমানা। আগের আইনের সঙ্গে ট্রাফিকের পজ মেশিনসহ অন্য বিষয়গুলোর মিল থাকলেও নতুন আইন বাস্তবায়ন হলেও পজ মেশিনগুলো করা হয়নি আপডেট। যে কারণে নতুন সড়ক আইন ভঙ্গ হলেও মামলা করা যাচ্ছে না। দু’-চারটি মামলা হলেও তা কাগজের মাধ্যমে। নতুন আইন পুরোদমে কার্যকর করতে হলে পজ মেশিনের সফটওয়্যারসহ অন্য বিষয়গুলোও আপডেট করতে হবে বলছেন মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আমাদের ট্রাফিক বিভাগে জনবল বাড়াতে হবে। যে জনবল আছে তাদের নতুন আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে ট্রেইনআপ করা হবে। তা ছাড়া নতুন আইনটির সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথচারী, পরিবহন চালক হেলপারসহ সকল অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের চাপে এবং আন্দোলনের তোপে পড়ে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে সরকার। যদিও মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এটি কার্যকর করতে সরকারের সময় লেগেছে এক বছর। এদিকে নতুন আইনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে— দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান। এই অপরাধে দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে তদন্তে প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর হবে। অর্থাৎ মৃত্যুদ-ের সুযোগও থাকছে। এই ধারার অপরাধ অজামিনযোগ্য। পুরনো আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদ- এবং এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। এছাড়া অতিরিক্ত মালবোঝাই ও নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন চালিয়ে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পদের হানি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদ-ের বিধান করা হয়েছে। অথবা তিন লাখ টাকার জরিমানা ও উভয় দ-ে দ-িত হবেন। পুরোনো আইনে এই অপরাধ কয়েকটি ধারায় বিভক্ত ছিলো। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিলো ছয় মাসের কারাদ- বা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। মামলা তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (এআরআই) সম্পৃক্ত করার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, বিধি প্রণয়ন না করেই আইন প্রয়োগে জটিলতা হতে পারে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সাজার ধারা জামিনযোগ্য করা এবং ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর না করার দাবি জানান তিনি। কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। পুরনো আইনে এ অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ সাজা চার মাসের কারাদ-, বা ৫০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-। দেশে যানবাহন আছে প্রায় ৪০ লাখ। চালক আছেন ২৩ থেকে ২৪ লাখ। বাকি ১৬ থেকে ১৭ লাখ যানবাহনের চালকের লাইসেন্স নেই অথবা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে চালান। নতুন আইনে ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকের শাস্তি কমপক্ষে এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বনি¤œ ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া আইনে প্রত্যেক চালকের জন্য ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নানা অপরাধে পয়েন্ট কাটা গিয়ে শূন্য হয়ে গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। যাত্রীবাহী বাসের কন্ডাক্টরদের (ভাড়া আদায়কারী) লাইসেন্স না থাকলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে নিবন্ধন সনদ না নিয়ে রাস্তায় যানবাহন নামালে মালিকদেরও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ- ভোগের বিধান রাখা হয়েছে। ভুয়া নম্বরপ্লেট দিয়ে যানবাহন চালালে সর্বনি¤œ এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বনি¤œ ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদ- অথবা উভয় দ-েরও বিধান রাখা হয়েছে। দেশে এখনো প্রায় পাঁচ লাখ যানবাহন ফিটনেস সনদ ছাড়া চলছে। নতুন আইনে ফিটনেসবিহীন যান চালানোর দায়ে সর্বোচ্চ জরিমানা ২৫ হাজার টাকা বা ছয় মাসের কারাদ-। অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। পুরনো আইনে এসব অপরাধের শাস্তি ছিলো তিন মাসের কারাদ- বা দুই হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-। রুট পারমিট না থাকলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ট্যাক্স-টোকেন হালনাগাদ না থাকলে কারাদ- নেই। জরিমানা ১০ হাজার টাকা। পুরনো আইনে এসব অপরাধের শাস্তি খুব সামান্য ছিলো। গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে ভাড়ার তালিকা না থাকলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। একই সঙ্গে এটি চালকের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তার এক পয়েন্ট কাটা যাবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাবে ভাড়ার মিটার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। তবে এসব যানের প্রায় কোনোটারই মিটার সচল নেই। থাকলেও মিটার মেনে যাত্রী বহন করে না। আগের আইনে এর জন্য কোনো শাস্তির বিধান ছিলো না। এখন মিটার বিকল থাকলে এবং যেকোনো গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনে অস্বীকৃতি জানালে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ের ব্যবস্থা আছে। যানবাহনচালককে যেমন সংকেত মেনে চলতে হবে, তেমনি পথচারীকে সড়ক-মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, পথচারী-সেতু, পাতালপথসহ নির্ধারিত স্থান দিয়ে পার হতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে চালক ও পথচারীকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে পড়তে হবে। যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর অপরাধে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিলো। নতুন আইনে এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ের মুখোমুখি হতে হবে। কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। সরকার নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি পার্কিং করলে বা যাত্রী-মালামাল ওঠানামার দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করার সুযোগ আছে। দেশের পরিবহন খাত থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে। চাঁদাবাজির বিষয়টি আগের আইনে উপেক্ষিত ছিলো। এবার ফৌজদারি আইনের ১৭ ধারায় শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই ধারায় চাঁদাবাজির দায়ে সর্বোচ্চ তিন বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই-এর (নিসচা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নতুন আইন সঠিকভাবে কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে, শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। কারণ, আগের আইনে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার জরিমানা কেউ আমলে নিতো না। তবে আইনটি কার্যকরের আগে পর্যাপ্ত প্রচারণা চালানো হয়নি। প্রচারণার সংকটকে তিনি দুর্বলতা হিসেবেই দেখছেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ আইন কার্যকরে বিষয়ে লেখালেখি করছেন অনেকেই। তারা বলছেন, সড়কে বিশৃঙ্খলার বহু কারণ আছে। লাইসেন্স না থাকা, চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়া মনোভাব, মালিকের লোভ, আইনের দুর্বলতা, চাঁদাবাজি, পুলিশ বিআরটিএ-দুর্নীতি, গডফাদারদের দৌরাত্ম্য, ক্ষমতাসীনদের বেআইনি হস্তক্ষেপ, বিচারহীনতা এমন আরও কিছু। কিন্তু অন্য কিছু বিষয় কখনোই আলোচনায় আসে না। যেমন, ভুল নকশায় গাড়ি ও রাস্তা নির্মাণ, ট্রাফিক সাইনের অভাব, গতিনির্দেশক সাইন, ওয়ে-বে না থাকা ইত্যাদি। বাংলাদেশে গাড়ির ইঞ্জিন আমদানি করে যে বডি তৈরি করে তা কোন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী তৈরি হয়? একজন যাত্রীর জন্য কত বর্গফুটের আসন দরকার, তার উচ্চতা, দুই সারির মধ্যে ফারাক, পাশাপাশি কয়টা আসন হবে, যাত্রী ওঠানামার জন্য কয়টা দরজা থাকবে, কোথায় থাকবে, তা কতটুকু প্রশস্ত হবে, নিরাপত্তার জন্য কোন ধরনের হাতল থাকবে, আলো-বাতাসের কী ব্যবস্থা থাকবে এসব বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আছে বলে মনে হয় না। গাড়িতে কেন স্পিড গভর্নর বাধ্যতামূলক নয়? হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি কেন নিষিদ্ধ নয়। কেন বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এগুলো নিশ্চিত করে না? কেন সওজ, সিটি কর্পোরেশন, এলজিইডি এগুলো নিশ্চিত করে না? কেন নিরাপদ ফুটপাতহীন সড়ক নির্মিত হয়? কেন দৃষ্টি আড়াল করে স্থাপনা নির্মাণ করতে দেয়া হয়? নেতানেত্রীদের বন্দনাসূচক বিলবোর্ডে পথ ঢেকে রাখে কারা? এদের কেন শাস্তির ব্যবস্থা হয় না?’

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)