ছবির ক্যাপশন:
সরকারের খরচ হবে ৮৮২ কোটি টাকা নতুন এমপিও পেয়েছে মাত্র ১৪১৩টি বিশেষ বিবেচনায় ২৩৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
সমীকরণ প্রতিবেদন: দীর্ঘ সাড়ে ৯ বছর পর ২৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) এমপিওভুক্তির ঘোষণা করা হলেও প্রায় অর্ধেক পুরানো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নতুন করে মাত্র ১৪১৩টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকারিভাবে বেতন-ভাতা পাবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে স্তর পরিবর্তন করা হয়েছে, সেগুলো এমপিওভুক্ত বলা যাবে না; এটা শুভঙ্করের ফাঁকি। তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত হলেই সেটাকে এমপিও বলতে হবে। স্তর হলো, নাকি নতুন হলো সেটা মুখ্য বিষয় না। কারণ স্তর এমপিও হলেও সেখানে নতুন জনবল এমপিওভুক্ত হবে। জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ১৬৫১ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের ১০৭৯ মোট ২৭৩০টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। তার মধ্যে এমপিওভুক্তির শুরু হয় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে। অর্থাৎ নিম্ন মাধ্যমিক স্তর ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম পর্যন্ত। তারপর শুধু স্তর পরিবর্তন হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ১৬৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নি¤œ মাধ্যমিক স্তরের এমপিও পেয়েছে ৪৩৯টি প্রতিষ্ঠান। কলেজ পর্যায়ে ৯৩টি প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়েছে। আর মাদ্রাসায় দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল- এ চার স্তরে এবার প্রথম এমপিও হয়েছে ৩৫৯টি প্রতিষ্ঠান। কৃষিতে ৬২টি, ভোকেশনাল স্বতন্ত্র ৪৮, ভোকেশনাল সংযুক্ত ১২৯টি, বিএম স্বতন্ত্র ১৭৫টি, বিএম সংযুক্ত ১০৮টি প্রতিষ্ঠান এবার নতুন করে এমপিও পেয়েছে। বিশেষ বিবেচনায় ২৩৫ প্রতিষ্ঠান এমপিও : মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মোট ৮৯টি উপজেলা ও থানা থেকে একটি প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য কাম্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিক সামঞ্জস্যতা বিধানের জন্য এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এ ২২ ধারা প্রয়োগ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, শিক্ষায় অনগ্রসর, ভৌগোলিকভাবে অসুবিধাজনক, পাহাড়ি, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল, নারীশিক্ষা, সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। ৮৯টি উপজেলায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০ জন এবং স্বীকৃতি মেয়াদ দুই বছর বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ৫৮টি প্রতিষ্ঠান বাচাই করা হয়। বাকি ৩১টি উপজেলা থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদনই করেনি বলে বিবেচনা করতে পারেনি। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ১৭৭টি উপজেলা থেকে একটি করে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য কাম্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিক সামঞ্জস্যতা বিধানের জন্য এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এ ২২ ও ৩৫/৩৬ ধারা প্রয়োগ করে শিক্ষা উপজেলা বা থানায় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ৫৪টি কারিগরি ও ৪৫টি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া দেশের দুর্গম অঞ্চল হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় এলাকার যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০০ জন বা তদূর্ধ্ব এবং স্বীকৃতির মেয়াদ কমপক্ষে ২ বছর পূর্ণ হয়েছে এমন ৫১টি প্রতিষ্ঠানকে নীতিমালা ২২ অনুযায়ী এমপিও দেয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নি¤œ মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) ১৯৬৭টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এর মধ্যে ৪৩৯টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের ( ষষ্ঠ থেকে ১০ শ্রেণি) ১০৮টি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় (নবম শ্রেণি থেকে ১০ শ্রেণি) ৮৮৭টি স্কুল এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এ স্তরে ১৭৩৯টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় (একাদশ থেকে দ্বাদশ) ৩৩৬টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এর মধ্যে ৬৮টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। কলেজ (একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি) ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে ৯৩টি। ডিগ্রি কলেজ (স্নাতক প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ) ৫৫৫টি কলেজ আবেদ করলেও ৫৬টি প্রতিষ্ঠান এমপিভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ৬০০ নতুন স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। বাকিগুলো প্রতিষ্ঠানের স্তর পরিবর্তন তথা যেসব স্কুল নিম্ম মাধ্যমিক স্তরের এমপিও ছিল সেগুলো মাধ্যমিক (নবম ও দশম শ্রেণি) স্তর এমপিভুক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এমপিওভুক্ত কমিটির আহ্বায়ক জাবেদ আহমদ বলেন, এবারের এমপিও ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে থাকবে। কারণ এখানে কোনো তদবির বা অন্য কিছুর আশ্রয় নেওয়া হয়নি। তবে ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ বিবেচনায় কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়েছে সেটি একটি মানদন্ড রক্ষা করেই। তাই এ এমপিও নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। খরচ বাড়ল ৮৮২ কোটি টাকা: মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৬৫১টি স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্ত করায় এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ চলতি অর্থ বছরে ৪৫০ কোটি ৮৩ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪০টাকা দরকার হবে। তবে এ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য চলতি অর্থ বছরে এমপিও খাতে ৮৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে যাচাই-বাছাই করে চলতি অর্থ বছরে আরও প্রতিষ্ঠান এমপিভুক্ত করা হবে। কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ৫৫৭টি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে মাত্র ৩৫৯টি দাখিল মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। বাকিগুলো স্তর পরিবর্তন করা হয়েছে। আলিম ১২৭টি, ফাজিল ৪২টি, কামিল স্তরের ২৯টি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। আর ৫২২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি ৬২টি, ভোকেশনাল স্বতন্ত্র ৪৮টি ও ভোকেশনাল সংযুক্ত ১২৯টি, বিএম স্বতন্ত্র ১৭৫টি ও বিএম সংযুক্ত ১০৮টি নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন করে মাত্র ৮৮১টি মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১০৭৯টি মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে চলতি অর্থ বছরে ৪৩১ কোটি তিন লাখ ৮১ হাজার ৪২০ টাকা দরকার হবে। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ আছে ২৮২ কোটি টাকা। অতিরক্ত ১৪৯ কোটি তিন লাখ ৮১ হাজার ৪০০ টাকা দরকার হবে। চলতি অর্থ বছরের বাজেটে বরাদ্দ সাপেক্ষে সমন্বয় করা হবে। গত বছর ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিদ্যালয় (বুয়েট) তৈরি করা বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সারাদেশে এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া হয়। এমপিওভুক্তির নীতিমালা-২০১৮-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, চারটি মানদন্ডে প্রতিষ্ঠান যাছাই করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের বয়স ২৫ নম্বর, শিক্ষার্থীর সংখ্যার ক্ষেত্রে ২৫ নম্বর, পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫ নম্বর এবং পাসের হারে ২৫ নম্বর করে মোট ১০০ নম্বরের গ্রেডিং করা হয়। সেখানে সর্বনি¤œ ৭০ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য যোগ্য বলে তালিকা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমপিও নীতিমালা-২০১৮-তে এমপিওভুক্তির জন্য পাঁচটি স্তর নির্ধারণ করা হয়। স্তরগুলো হলো- নি¤œ মাধ্যমিক (৬ষ্ঠ থেকে ৮ম), মাধ্যমিক (৯ম থেকে ১০ম), উচ্চমাধ্যমিক (৬ষ্ঠ থেকে ১২শ), কলেজ (১১শ থেকে ১২শ), স্নাতক (পাস) তথা ডিগ্রি কলেজ (১১শ থেকে ১৫শ)। এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মোট আবেদন জমা পড়েছিল ৬ হাজার ১৪১টি।
