ছবির ক্যাপশন:
ঝিনাইদহ অফিস:
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান রাজাকার আব্দুর রশিদ মিয়া এবং রাজাকার শাহেব আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার নারায়ণপুর ত্রিমহনী থেকে সাদা পোশাকের একদল পুলিশ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। আওয়ামী লীগের নেতা মিয়া আব্দুর রশিদ এ সময় ডাকবাংলা চাল কল মালিক সমিতির নির্বাচন পর্যবেক্ষন করছিলেন।
ঘটনাস্থলে থাকা হলিধানী ইউনিয়নের মেম্বার মতিয়ার রহমান ও সাগান্না ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, ‘গতকাল দুপুরের দিকে সাদা পোশাকের একদল লোক আব্দুর রশিদকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা তাদের চিনতে পারিনি।’
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান জানান, মানবতাবিরোধী মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুয়ায়ী আব্দুর রশিদ ও শাহেব আলী নামে দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ সদর উপজেলার কোলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য আশির উদ্দীন তাঁর এলাকার ৬ রাজাকারের বিরুদ্ধে ঝিনাইদহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। যার নম্বর ঝি/সি ৭৯/০৯। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি প্রাথমিক অনুসন্ধান করে ঝিনাইদহ সদর থানার ওসিকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে সে সময় মামলাটি আপোষরফা করতে বাধ্য হন মুক্তিযোদ্ধা আশির উদ্দীন।
অভিযোগপত্রে আশির উদ্দীন উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্থানি পক্ষ ত্যাগ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আশির উদ্দীন দেশ স্বাধীনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। এ খবর জানতে পেরে রাজাকার মসলেম উদ্দীন, আব্দুর রশিদ, আলাউদ্দীন, হাকিম আলী খোন্দকার, শাহজাহান, আসমত, শাহেব আলীসহ ৫০ জন রাজাকার কোলা গ্রামে তাঁর বাড়ি ঘেরাও করেন। আশির উদ্দীন ও তাঁর আরেক ভাই মহিরুদ্দীন এ সময় কাশিপুর গ্রামের দিকে পালিয়ে যান। রাজাকাররা তাঁদের দুই ভাইকে না পেয়ে বড় ভাই আজিবর ম-ল, হবিবার ম-ল ও আনসার ম-লকে ধরে নিয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের ব্রিজের নিচে হত্যার পর লাশ গুম করে। আসামিরারা এ সময় তাঁদের পাঁচটি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের আরও ২৫টি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন। রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন বৃদ্ধ পিতা দুখি মাহমুদ ও মা কামিনী খাতুনকে। মুক্তিযোদ্ধা আশির উদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁর ভাতিজা আনোয়ার হোসেন দেশে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালে আরেক দফা অভিযোগ করেন বলে তাঁদের পারিবারিক সূত্রে বলা হয়েছে।
গত ৯-১০ মাস আগে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনাল থেকে তদন্তে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর জালিয়ে দেওয়া ও স্বজনদের হত্যার প্রমাণ সংগ্রহ করে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, দেশ স্বাধীনের পর আইডিএল, জামায়াত, চরমপন্থি সংগঠন হক গ্রুপ, সর্বহারা ও সর্বশেষ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন রাজাকার আব্দুর রশিদ। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাজাকার থেকে রাতারাতি আওয়ামী লীগের হয়ে নৌকা প্রতীকে ইউপি নির্বাচন করেন এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তাঁর দুই ছেলে হারুন ও বজলুর রশিদও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁরাও খুব বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করেন বলে এলাকাবাসির অভিযোগ। এলাকায় কথিত আছে চাঁদাবাজী, ইয়াব, অস্ত্র ব্যাবসা ও শালিস বিচারের নামে কোটি কোটি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন এ রাজাকার পরিবার। তাঁদের অত্যাচারে হলিধানী ইউনিয়নের মানুষ এক রকম অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। গুজব আছে আওয়াী লীগকে সিড়ি বানিয়ে ঝিনাইদহ, ঢাকা ও ভারতেও বাড়ি তৈরি করেছে রাজাকার আব্দুর রশিদ।
এ বিষয়ে আব্দুর রশিদের বড় ছেলে হারুন অর রশিদ জানান, ‘কে বা কারা আমার পিতাকে ধরে নিয়ে গেছে, তা আমি বলতে পারি না। তবে ঝিনাইদহের কোনো জায়গায় খুঁজে আমি আমার পিতার সন্ধান পায়নি।’
ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মকবুল হোসেন জানান, দুই রাজাকার গ্রেপ্তার বা আর্ন্তজাতিক ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলার খবর তিনি জানেন না।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান খবরের সত্যতা স্বীকার করে জানান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় আব্দুর রশিদ ও শাহেব আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
