কাজল মাহমুদ
কনিষ্ঠ শিল্পমাধ্যম হয়েও এক শ বছরের মধ্যেই চলচ্চিত্র ব্যাপক আবেদন সৃষ্টি করেছে। চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম, যা অন্য প্রায় সব মাধ্যম থেকেই যথেচ্ছ উপাদান গ্রহণ করেছে। এতে আছে পেইন্টিংয়ের আলো-ছায়ার খেলা, নাটকের নাটকীয়তা, সংগীতের সুরব্যঞ্জনা, কবিতার বিমূর্ততা, নৃত্যের তাল-লয়-মুদ্রা, আবৃত্তির ছন্দ-মাত্রা ইত্যাদি।
বিভিন্ন মাধ্যমের সংমিশ্রণে তৈরি বলে অনেকে চলচ্চিত্রকে যৌগিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী আখ্যাটি দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। তিনি শিল্পের ধারণাকে উহ্য রেখে চলচ্চিত্রকে বলেছেন ভাষা, চলচ্চিত্রের ভাষা।
শিল্পবোদ্ধাদের এ ভাষা জানতে হয়, শিখতে হয়, এই ভাষা আয়ত্ত করতে হয়। ধন্যবাদ ‘ক্রসফায়ার’-এর পরিচালক আনোয়ার হোসেনকে, যিনি এ ভাষার ব্যাকরণ জেনেছেন। কীভাবে জেনেছেন, সে কথা না হয় একটু পরেই বলি। তার আগে জেনে নিই, এ ভাষা সম্পর্কে আরও কিছু।
লেখকের হাতে যেমন কথা বা শব্দ, এ জন্য তিনি কথাশিল্পী বা শব্দশিল্পী, চলচ্চিত্র রচয়িতা বা নির্মাতার হাতেও তেমনি ছবি ও শব্দ। দুই ক্ষেত্রেই শব্দ কিন্তু এক অর্থ বহন করে না; সাহিত্যিকের কাছে শব্দ, যাকে ইংরেজিতে বলে ড়িৎফ; চলচ্চিত্রকারের কাছে শব্দ, যাকে ইংরেজিতে বলে ংড়ঁহফ। ছবি মানেও কিন্তু শুধু ঢ়রপঃঁৎব নয়, এখানে ছবি মানে রসধমব।
চলচ্চিত্রের ইমেজ নিছক ছবি নয়, এখানে ইমেজ মানে বাক্সময় ছবি। প্রতিটি ইমেজ কথা বলবে কিছু না কিছু, অর্থ বহন করবে, ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো সংলাপ-নিরপেক্ষ হয়েও। ংড়ঁহফ বা ধ্বনি কাজ করবে ইমেজের পরিপূরক হিসেবে, যেমনটি আনোয়ার হোসেন পরিচালক হিসেবে দক্ষতার সাথে করেছেন ‘ক্রসফায়ার’-এ। শব্দের প্রসঙ্গ এসে গেলে ‘ক্রসফায়ার’কে সম্পূর্ণ নির্বাক চলচ্চিত্র বলা যাবে না। যদিও ‘ক্রসফায়ার’ দেখলে প্রাসঙ্গিকভাবেই নির্বাক চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়তে পারে; ব্যাটেলশীপ পটেমকিন, গোল্ড রাশ, নানুক অব দ্য নর্থ, আমাদের দেশের ‘দি লাস্ট কিস’ (১৯৩১ সালে নির্মিত) ইত্যাদি শিল্পোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র যার অনন্য উদাহরণ।
সত্যজিৎ রায়ের মতে, সবাক চলচ্চিত্র ও নির্বাক চলচ্চিত্র দুটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম। এ দুয়ের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি, আঙ্গিক, প্রকরণ সবই পৃথক। চলচ্চিত্র, তা সবাক বা নির্বাক, যাই হোক না কেন, তা চলচ্চিত্র হবে কি না, তা নির্ভর করে এটি নিতান্ত সাধারণ-স্তর ছাড়িয়ে চৈতন্যের স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে কি না, তার ওপর। ‘ক্রসফায়ার’ এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পেরেছে বলেই প্রায় শব্দহীন ভাষার এক অনন্য মানবিক দলিল হিসেবে ইতিমধ্যেই স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৩ মিনিটের এ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কোথাও বাঁক না থাকলেও একদম শেষে মুখনিঃসৃত ‘ক্রসফায়ার’ সবাক এক ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছে। এ সংযোজন মনে করিয়ে দেয়, সাদা-কালোয় নির্মিত বিশ^খ্যাত চলচ্চিত্র ঝপযরহফষবৎ’ং খরংঃ, সাদা-কালো পোশাকের সকল মানুষের মাঝে একমাত্র ছোট্ট মেয়েটির লাল ফ্রক ব্যতিক্রম হিসেবেই আমাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ফিরে আসে, স্বপ্ন দেখায়। উচ্চারিত ‘ক্রসফায়ার’ শব্দও আমাদের মনে নানামাত্রিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি করে। ছবি দেখা শেষ হলেও প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের বেশ কিছুক্ষণ ভাবায়। পরিচালকের মুন্সিয়ানা তো এখানেই, যা আমাদের সেই চৈতন্যের স্তরে নিয়ে যায়, চলচ্চিত্রের ভাষা বোঝার জন্য যা আবশ্যক।
কিন্তু চলচ্চিত্রের ভাষা আয়ত্ত হলেও তাকে রূপ দেওয়া বা ব্যক্ত করা পরিচালকের একার কর্ম নয়। সিনেমা যাঁরা দেখেন, তাঁরা লক্ষ করেন, পর্দায় কাহিনি শুরু হবার আগে বা পরে কলাকুশলীদের পরিচয়লিপি দেওয়া হয়। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে চলচ্চিত্র একটা যৌথশিল্প। গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী কবীর সুমনের অনুরাগী আনোয়ার হোসেন নিশ্চয়ই তাঁর ‘সহশিল্পীরা এসো’ শিরোনামের গানের কথা জানেন বলেই সিনেম্যাডের সকলকে মূল্যায়ন করেন সেই যৌথশিল্প রচনায়। এভাবেই বহুমাত্রিক সংস্কৃতিজন আনোয়ার হোসেন আরও এগিয়ে যাক। তাঁর হাতে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের আরও নতুন নতুন সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটুক, চুয়াডাঙ্গার সংস্কৃতি-কর্মীদের এ শুভেচ্ছা জ্ঞাপন অনিঃশেষ।
