ছবির ক্যাপশন:
এসএম শাফায়েত:
সারা দেশেই যখন গুজব-আতঙ্কে সাধারণ মানুষ তটস্থ, ঠিক সেই মুহূর্তেই চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার চিৎলা ইউনিয়নের কয়রাডাঙ্গা গ্রামের একটি ইটভাটার পার্শ্ববর্তী আমবাগান থেকে মিলল ১১ বছর বয়সী মাদ্রাসা শিশু আবির হুসাইনের মাথাবিহীন লাশ। নিহত আবির ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলী হোসেন ও গোলাপী বেগমের বড় ছেলে। বছর খানেক আগে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পিতা আলী হোসেন দুবাইয়ে পাড়ি জমান। এরপর থেকেই দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন মা গোলাপী বেগম। গত এপ্রিল মাসের এক তারিখে দূর সম্পর্কের মামা হাফেজ মাওলানা তামিম বিন ইউসুফের পরামর্শে কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার নুরানী বিভাগের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় আবিরকে। মামা তামিম এই মাদ্রাসারই শিক্ষক। এরপর থেকে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে মাদ্রাসাতেই থাকতো শিশু আবির।
যে ভাবে নিখোঁজ হলো আবির:
মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে শিক্ষক ও অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে এশার নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল আবির। সবাই মাদ্রাসার মসজিদে নামাজ আদায় করতে গেলেও সে নামাজে যায়নি। এরপর রাতের খাবারের জন্য সবাই একত্রিত হলে সেখানেও আবিরের দেখা মেলেনি। তার অনুপস্থিতিতে সবাই রাতের খাবার খাওয়া শেষ করে তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষক ও ছাত্ররা আলাদা আলাদা ভাগে বিভক্ত হয়ে গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। ওই রাতেই তার নিখোঁজের খবর জানানো হয় স্থানীয় গোকুলখালী ফাঁড়ি পুলিশকে। রাতভর অনেক খোঁজাখুজির পরও সন্ধান মেলেনি আবিরের।
যে ভাবে পাওয়া গেলো নিখোঁজ আবিরের মাথাবিহীন লাশ:
ভোরে ফজরের নামাজ শেষে আবারও শুরু হয় নিখোঁজ আবিরের সন্ধান অভিযান। শিক্ষক, ছাত্র ও গ্রামবাসীরা এলাকার বিভিন্ন অলিগলি, মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার ও বাগানে বাগানে হন্নে হয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে একদল ছাত্র ভালাইপুর-আসমানখালী সড়কের খাদিমপুর মোড়ের কেডিবি ইটভাটার পার্শ্ববর্তী আমবাগানের মধ্যে একটি মাথাবিহীন মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে শিক্ষকদের খবর দেয়। খবর পেয়ে মাদ্রাসার সভাপতি হাজি ইয়ামিন আলী বিশ্বাস, মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুফতি আবু হানিফসহ অন্য শিক্ষকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে মরদেহ ও পোশাক দেখে নিখোঁজ আবিরকে শনাক্ত করেন। তবে পাওয়া যায়নি মরদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথাটি। বিষয়টি তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানানো হলে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ (সদর ও আলমডাঙ্গা সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ ও আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান মুন্সী ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন। এ সময় লাশ দেখতে আসা উৎসুক জনতার তোপের মুখে পড়েন পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা হত্যাকারী-অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারপূর্বক কঠোর শাস্তির দাবিতে মরদেহ ঘিরে বিক্ষোভ করতে থাকে। এরপরই হত্যাকা-ের তথ্যানুসন্ধানে মাঠে নামে ডিবি, ডিএসবি, সিআইডি, থানা-পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব-৬) সদস্যরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ডিসি-এসপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা:
মরদেহ উদ্ধারের পর সকাল ১০টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস, পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) কানাই লাল সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর ও আলমডাঙ্গা সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেড কোয়াটার্স) আবুল বাশারসহ জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ঝিনাইদহ ব্রাঞ্চের এসপি আবু আশরাফও পরিদর্শনে আসেন। সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র্যাব ৬-এর ঝিনাইদহের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর শামীম। এর আগে দুপুরের দিকে র্যাবের একটি দল নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র্যাব ৬-এর ঝিনাইদহের কোম্পানি কমান্ডার মাসুদুল আলম।
মাথা খুঁজতে ‘ডগ স্কোয়াড’, পুকুরে ডুবুরি:
মরদেহ উদ্ধারের পর নিখোঁজ মাথাটি উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ ও র্যাবের একাধিক দল। বিকেল চারটার দিকে র্যাব হেড কোয়াটার্স থেকে ডিএডি জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ডগ স্কোয়াড’ হেলিকপ্টারযোগে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। এরপর র্যাবের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুটি কুকুর দিয়ে ঘটনাস্থল ও তার আশপাশ এলাকা সুইপিং করানো হয়। তবে তাতে কোনো সুফল মেলেনি। এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে ৩৫-৪০ গজ দূরে রয়েছে একটি বিশালাকার পুকুর। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, ওই পুকুর তল্লািশ করা হলে নিখোঁজ মাথাটি মিলতেও পারে। পরে খুলনা থেকে রাত সাড়ে আটটার দিকে পাঁচ সদস্যের একটি ডুবুরির দল সেখানে পৌঁছায়। চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুস সালামের নেতৃত্বে ‘চিরুণি’ অভিযানে নামে দলটি। ডুবুরি দলের দুই সদস্য কয়েক ঘন্টাব্যাপী পুকুরের গভীর পানিতে ও তার আশপাশে অনুসন্ধান চালান। তাতেও খুঁজে পাওয়া যায়নি নিখোঁজ মাথাটি। তবে খোঁজাখুঁজি এখনো চলমান রয়েছে। সমগ্র অভিযানের নির্দেশনায় আছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর ও আলমডাঙ্গা সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ। অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই নিখোঁজ মাথাটি খুঁজতে জোর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত আসামিদের ধরতেও ব্যাপক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাদ্রাসার মুহতামিমসহ পাঁচ শিক্ষককে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ময়নাতদন্ত ও লাশ হস্তান্তর:
গতকাল মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে আবিরের মাথাবিহীন মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শামীম কবিরের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক দল এ মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন। পরে এ প্রসঙ্গে সময়ের সমীকরণকে আরএমও ডা. শামীম কবির জানান, ‘ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির শরীর থেকে মাথাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। হত্যার পূর্বে তাকে বলাৎকারও করা হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। মৃতদেহ থেকে সোয়াব ও ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মূল তথ্য জানা যাবে।’ এদিকে, রাত সাড়ে নয়টায় নিহত আবিরের মা গোলাপী বেগমসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা আবিরের মরদেহ গ্রহণ করেন। রাতেই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের দৌলতপুরের উদ্দেশে। সেখানেই আবিরের লাশের দাফনকার্য সম্পন্ন করা হবে।
গুজবে আতঙ্কিত গোটা এলাকা:
সারা দেশে চলমান গুজব আতঙ্কের মধ্যে মাদ্রাসাছাত্রের মাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনা আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে আলমডাঙ্গা উপজেলার চিৎলা ইউনিয়নসহ পুরো চুয়াডাঙ্গা জেলাবাসীকে। ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে এই অঞ্চলের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুসন্তানদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে দেখা যায় অভিভাবকদের। ঘটনার পর থেকে কয়রাডাঙ্গা নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ৭১ জন শিক্ষার্থীর সবাই মাদ্রাসা ত্যাগ করে নিজ নিজ বাড়ি ও নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। এরপর থেকে মাদ্রাসাটিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কঠোর নজরদারিতে রেখেছেন। এ ছাড়া আশপাশ এলাকার অন্য মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোডিং ও এতিমখানাগুলো থেকেও অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে বিকেল থেকে প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলতে দেখা যায়। দিনভর নানা আলোচনা-সমালোচনায় তটস্থ ছিল গ্রাম-শহর, হাট-বাজার, দোকান-পাট, মাঠ-ঘাট ও অফিস-আদালতপাড়া। জেলার দায়িত্বশীল সব পিতা-মাতার চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপারের কাছে দাবি, তাঁরা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে থাকতে চান। সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে যেন প্রাণহানি বা নিখোঁজের সংবাদ তাঁদের শুনতে না হয়। এদিকে, সারা দিনের শোরগোল শেষে সন্ধ্যা নামতেই হাট-বাজার থেকে শুরু করে অজপাড়াগা পর্যন্ত এক অজানা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুনশান-নীরব পরিবেশে যেন কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা আর না ঘটতে পারে, সে জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার) বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর লাশ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করি। সেখানে ময়নাতদন্ত শেষে প্রাথমিকভাবে নিহত আবিরের মলদ্বারে বলাৎকারের আলামত পাওয়া গেছে। কীভাবে, কোথায় এ ঘটনা ঘটেছে তদন্ত সাপেক্ষে বিষয়টি আমরা আরও পরিষ্কার করে বলতে পারব।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘চারদিকে ছেলেধরা, গলাকাটা নামে যে গুজব বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে জনগণকে বলতে চাই, কোনো বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আপনারা সর্বদা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা রাখুন। আমরা আশা করি, দ্রুতই ঘটনার অন্তরালের বিষয়টি জনসম্মুখে আসবে। এখন পর্যন্ত সারা দেশে গুজব-সংক্রান্ত বিষয়ে যতগুলো ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তার কোনোটাই প্রমাণিত হয়নি। প্রতিটি ঘটনার পিছনেই আলাদা আলাদা ঘটনা লুকিয়ে ছিল, যা পরবর্তী তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।’
