ছবির ক্যাপশন:
সড়কে মৃত্যু নিয়ে ডাব্লিউএইচওর পর্যবেক্ষণ
গাড়ির গতি গড়ে ৫% কমানো হলে সড়কে হতাহতের সংখ্যা ৩০% কমবে। মানসম্মত হেলমেট সঠিকভাবে পরলে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০% এবং গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি ৭০% কমবে সমীকরণ প্রতিবেদন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ লোকের মধ্যে ১৫ দশমিক ৩ জনের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। এ হিসাবে প্রতিবছর বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যু হয় প্রায় ২৪ হাজার ৯৫৪ জনের। যদিও সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। সড়ক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘ড্রিংক ড্রাইভিং’ (মদ পান করে গাড়ি চালনা), ‘স্পিড’ (গতি), ‘হেলমেট’, ‘সিট-বেল্ট’ ও ‘চাইল্ড সিট’(শিশুদের জন্য আসন) এ পাঁচটি বিষয়েই ভালো আইন নেই বাংলাদেশের। জাতিসংঘ ঘোষিত পঞ্চম বিশ্ব নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ উপলক্ষে বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয় তাদের ফেসবুক পেজে গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি ‘ইন্টারেকটিভ রিপোর্ট’ প্রকাশ করে বলেছে, ‘এক গুচ্ছ ধারাবাহিক জাতীয় সড়ক নিরাপত্তার কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সম্পৃতি সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।’ ডাব্লিউএইচও তার ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘সড়কে মৃত্যু’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে ‘ড্রিংক ড্রাইভিং’ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সাধারণ জনগণের প্রতি লিটার রক্তে অ্যালকোহলের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ গ্রাম এবং তরুণ বা শিক্ষানবিশ চালকদের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার রক্তে অ্যালকোহলের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য দুই গ্রামের বেশি হলে গাড়ি চালানো অপরাধ এমন আইনকেই ভালো ‘ড্রিংক ড্রাইভিং’ আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ডাব্লিউএইচও। সংস্থাটি বলেছে, কেউ সামান্য মদ পান করলেই তার গাড়ি চালানোর ধরন বদলাতে শুরু করে। তবে মাত্রাতিরিক্ত মদ পান করলে, বিশেষ করে রক্তে অ্যালকোহলের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ গ্রাম/লিটার ছাড়িয়ে গেলে এ মাত্রা আরো বেড়ে যায়। বিশ্বের মাত্র ৪৫টি দেশে সাধারণ চালকদের জন্য রক্তে অনুমোদিত অ্যালকোহলের মাত্রা শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ গ্রাম/লিটার এবং তরুণ বা শিক্ষানবিশ চালকদের জন্য শূন্য দশমিক শূন্য দুই গ্রাম পর্যন্ত নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানকারীদের মধ্যে অস্বাভাবিক ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা থাকে। এ ক্ষেত্রে চালক নিজেই সিট-বেল্ট বাঁধেন না। এ অবস্থায় গাড়ি চালালে কেবল তিনি নিজে নন, অন্য গাড়ির লোকজনের বা পথচারীদেরও হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-তে বলা হয়েছে, মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কোনো চালক গাড়ি চালাতে পারবে না। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে চালকের পয়েন্ট কাটারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ওই আইনে। এর পরও ডাব্লিউএইচওর পর্যবেক্ষণে ‘ড্রিংক ড্রাইভিং’ ক্যাটাগরিতে এই আইনটিকে কেন ভালো বা আদর্শ বলা হলো না তা স্পষ্ট নয়। শহর এলাকায় গতিসীমা ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে জাতীয় আইন প্রণয়ন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনবোধে সেই গতিসীমা পরিমার্জনের সুযোগ রাখাকে ডাব্লিউএইচও ভালো আইন বলে থাকে। শহর এলাকায় নানা ধরনের যানবাহনের পাশাপাশি সাইকেল ও পথচারীরাও চলাচল করে বিধায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের বেশি না করার পক্ষে ডাব্লিউএইচও। এ ছাড়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আবাসিক এলাকায় গাড়ির গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার নির্ধারণ এবং ‘স্পিড বাম্প’ (গতিরোধক) বসানোর সুযোগ দেওয়ার পক্ষে এইচআরডাব্লিউ। সংস্থাটি বলেছে, বিশ্বের মাত্র ৪৬টি দেশে প্রত্যাশিত গতিবিষয়ক আইন আছে। উচ্চ আয়ের দেশে/এলাকায় সড়কে ৩০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ গাড়ির গতি। অন্যদিকে কিছু মধ্যম ও নি¤œ আয়ের দেশে গাড়ির গতিই সড়কে অর্ধেক মৃত্যুর প্রধান কারণ। গাড়ির গতি গড়ে ৫ শতাংশ কমানো হলে সড়কে হতাহতের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমবে। মোটরসাইকেলের হেলমেট ব্যবহার সংক্রান্ত প্রত্যাশিত আইন প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, যেকোনো ধরনের মোটরসাইকেলে চালক ও যাত্রীকে হেলমেট যথাযথভাবে পরার বিষয়টি নির্দিষ্ট থাকতে হবে। এর পাশাপাশি হেলমেটের মানের বিষয়টিও সুনির্দিষ্ট হতে হবে। ডাব্লিউএইচও বলেছে, মানসম্মত হেলমেট সঠিকভাবে পরলে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০ শতাংশ এবং গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমবে। বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সব আরোহীর জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হয় না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। সিট-বেল্ট সংক্রান্ত প্রত্যাশিত আইন প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, কেবল গাড়ির চালক ও সামনের আসনের যাত্রীরই নয়, পেছনের আসনের সব যাত্রীর সিট-বেল্ট বাঁধার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। গাড়ির সামনের আসনগুলোর চালক ও যাত্রী সিট-বেল্ট বাঁধলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পেছনের আসনের যাত্রীরা সিট-বেল্ট বাঁধলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ‘চাইল্ড সিট’ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, গাড়ির সামনের আসনে বসার জন্য শিশুর বয়স অন্তত ১০ বছর বা উচ্চতা ১৩৫ সেন্টিমিটার (প্রায় চার ফুট চার ইঞ্চি) কিংবা বয়স বা উচ্চতা সুনির্দিষ্ট করার বিষয়ে আইন থাকা জরুরি। ওই বয়স বা উচ্চতার চেয়ে কম বয়সী বা উচ্চতার শিশুদের জন্য গাড়িতে অবশ্যই উপযুক্ত ‘চাইল্ড রেসট্রেইন্ট’ (শিশুদের জন্য আলাদা বেল্ট) থাকতে হবে।
