ছবির ক্যাপশন:
প্রতিবেদক, দামুড়হুদা:
গ্রামের যাকেই জিজ্ঞেস করবেন সেই বলবে হাসান ছিল খুবই ন¤্র-ভদ্র একটি ছেলে। মাথা উঁচু করে কারো সাথে কখনও কথা বলেনি। এক কথায় ওর মতো ছেলেই হয়না। সেই ছেলেই শহরে লেখাপড়া করতে যেতে বদলে গেলো। মিথ্যা কথা বলে প্রায়ই বাবার কাছে টাকা নেয়া ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। ম্যেসে থেকে কুষ্টিয়া পলিটেকনিকে এভাবেই চলেছে হাসানের ডিপ্লোমা পড়াশুনা। এখানেই শেষ নয়, সরকারি চাকরি হয়েছে মিথ্যা বলে পিতার শেষ সম্বল ১ বিঘা জমিও বিক্রি করিয়েছে। এরই মাঝে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে প্রায় ৯ মাস আগে বিয়েও করেছে সে। অবশেষে অনুশোচনার একপর্যায়ে নিজেই নিজের কাছে হেরে গিয়ে আত্মহত্যা করে সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে দামুড়হুদার দেউলী গ্রামের যুবক হাসান (২২)।
জানা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলার দেউলী গ্রামের চা দোকানি হাফিজুর রহমানের একমাত্র ছেলে হাসান ২০১৩ সালে এসএসসি পাশ করার পর ডিপ্লোমা পড়ার জন্য কুষ্টিয়া পলিটেকনিকে ভর্তি হয়। মেসে থেকে ডিপ্লোমা পড়া শেষে ২০১৭ সালের শেষ দিকে হাসান তার পিতাকে জানায়, তার সরকারি চাকরি হয়েছে, কিšুÍ টাকা লাগবে। ছেলের চাকরি হয়েছে শুনে চা দোকানি পিতা হাফিজুর রহমান আর মা রোজিফা বেগম খুশিতে আবেগপ্লুত। কাল-বিলম্ব না করে পিতা হাফিজুর তার শেষ সম্বল ১ বিঘা জমি বিক্রি করে টাকা তুলে দেয় ছেলের হাতে। গ্রামের লোকজনকে মিষ্টি মুখ করাতেও কার্পন্য করেননি পিতা হাফিজুর রহমান। জমি বিক্রি করে টাকা দিলেও ছেলের কি চাকরি হয়েছে এবং কোথায় এমন প্রশ্নের সঠিক জবাব দেয়নি ছেলে হাসান।
এরই একপর্যায়ে প্রায় ৯ মাস আগে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে রাজশাহীতে আশা নামের এক মেয়েকে বিয়েও করে হাসান। বিয়ের বিষয়টি গোপনই ছিল। কিন্ত সম্প্রতি হাসানের স্ত্রী পরিচয়ে শ্বাশুড়ি রোজিফা বেগমের কাছে মোবাইলফোনে কথা বলে বউমা আশা। ছেলে বিয়ে করেছে। তাও আবারও কাউকে না জানিয়ে এমন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে প্রহর গুনতে থাকে পিতা-মাতা। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন বাববার উকি দিতে থাকে, যে ছেলে সাত চড়েও কথা বলতো না, গ্রামের সবাই যাকে একটা ন¤্র-ভদ্র ছেলে বলে জানে। সেই কি না একা একা বিয়ে করলো এ রকম দু:শ্চিন্তার এরই একপর্যায়ে সপ্তাহ খানেক আগে বাড়িতে আসে হাসান। মা-বাবাকে আর মিথ্যা বলতে পারেনি সে। বিয়েকে কেন্দ্র করেই পিতা-মাতার সাথে কথাকাটাকাটি হয় হাসানের। ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করে মা-বাবা। ভেঙ্গে পড়ে হাসান। অনুশোচনার একপর্যায়ে নিজেই নিজের কাছে হেরে যায় হাসান। সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যার। আত্মহত্যার আগে একটি চিরকুটে লিখে যায় তার স্ত্রীর নাম ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর। শেষে লেখা ছিল মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।
গতকাল বুধবার ভোরে গ্রামের বড় মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ার পরপরই চলে যায় বাড়ির অদূরবর্তী একটি আমবাগানে। ওই আমবাগানেই গলায় প্লাস্টিকের পাইপ পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে হাসান। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আমবাগানের একটি গাছে হাসানের মরদেহ ঝুলে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন। হাসান আত্মহত্যা করেছে এমন খবর বাড়িতে পৌছালে মা রোজিফা খাতুন কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন মা রোজিফা খাতুন। খবর পেয়ে দামুড়হুদা মডেল থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায় মরদেহ। বিকেলে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের লোকজনের কাছে লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ। হাসানের মরদেহ বাড়িতে পৌছুলে মা রোজিফা খাতুন, দু’বোন রাজিয়া ও সুরাইয়া খাতুনসহ স্বজনদের কাঁন্না আর আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বাদ মাগরিব নিহতের জানাজার নামাজ শেষে নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। ২ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে নিহত হাসান ছিল সকলের বড়।
