কারাগারে খালেদার ৩৬৫ দিন

আপলোড তারিখঃ 2019-02-07 ইং
কারাগারে খালেদার ৩৬৫ দিন ছবির ক্যাপশন:
জীবনধারাই বদলে গেছে সমীকরণ প্রতিবেদন: দিন-মাসের হিসাব পেরিয়ে কারাগারে বন্দি জীবনের এক বছরে বদলে গেছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জীবনধারা। রাত জাগার পুরনো অভ্যাস ত্যাগ করেছেন তিনি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার কক্ষের বাতি রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই নিভে যায়। পত্রিকা পড়া, কারারক্ষীদের সঙ্গে আড্ডা আর গৃহপরিচারিকা ফাতেমার সঙ্গেই কাটে তার দিবানিশি। আর কঠোরভাবে মেনে চলেন কারাবিধি। এভাবে ৮ ফেব্রুয়ারি কারাজীবনের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে তার। এবারই প্রথম কারাজীবন নয় খালেদা জিয়ার। এর আগে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি রাজনীতিতে যোগ দেয়ার পর তিনি মোট চারবার গ্রেপ্তার হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হন। তবে তখন তাকে বেশি দিন আটক থাকতে হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ৩৭২ দিন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার স্থাপিত বিশেষ সাব জেলে এক বছরেরও বেশি সময় ছিলেন তিনি। সর্বশেষ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিশেষ আদালতের রায়ে পাঁচ বছরের কারাদ- মাথায় নিয়ে কারাগারে ঢুকেন খালেদা জিয়া। ওই দিন থেকে পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয় তার কারাজীবন। তার বিরুদ্ধে ৩৫ মামলার মধ্যে একটিতে জামিন হলে, অন্য মামলা সামনে আসছে। এভাবেই চলছে জামিনের সংগ্রাম। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ কারাবন্দি হিসেবে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নামাজ আদায় ও পত্রিকা পড়ে ওই দিনটি কাটিয়েছেন খালেদা জিয়া। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পরিবারের চার সদস্য তার সঙ্গে দেখা করেন। টানা চার দিন সাধারণ কয়েদির মতো জীবনযাপনের পর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিভিশন পাওয়ার পর সেখান থেকে খালেদা জিয়াকে বন্দিদের সন্তান রাখার স্থান ডে-কেয়ার সেন্টারে নেয়া হয়। এরপর থেকে তাকে পড়ার জন্য একটি দৈনিক পত্রিকা দেয়া হয়। একজন ডিভিশনপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে সেখানেই কারাবাস করছেন তিনি। তার দেখাশোনার জন্য প্রথম দিন থেকে স্বেচ্ছায় কারাগারে রয়েছেন গৃহপরিচারিকা ফাতেমা। এ নিয়ে বিতর্কও হয়। পরে খালেদা জিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত খালেদা জিয়াকে দেখাশোনার জন্য ফাতেমাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে তার খাবার রান্না করা হয়। ওই খাবার প্রথমে উপকারাধ্যক্ষ ও কারাধ্যক্ষ খান। পরে চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর খালেদা জিয়াকে দেয়া হয়। তিন বেলাই এসব নিয়ম মানা হয়। কেন্দ্রীয় কারাগারে অধিকাংশ সময় চুপচাপই থাকেন খালেদা জিয়া। সময় কাটে ইবাদত বন্দেগি আর বই ও পত্রিকা পড়ে। এ ছাড়া গৃহকর্মী ফাতেমাসহ সেখানে দায়িত্বরত কারা মহিলা স্টাফদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সময় কাটে তার। সূত্র জানায়, কারাগারের সব নিয়মই মেনে চলছেন খালেদা জিয়া। তাকে কোনো বিষয় নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের অনুরোধও করতে হয় না। ২৮ মার্চ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার কথা থাকলেও তা করেনি কারা কর্তৃপক্ষ। অনাকাঙ্খিত কারণে খালেদা জিয়াকে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে হাজির করেনি দাবি করে শুনানির পরবর্তী তারিখ চান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। গত ৭ এপ্রিল সকালে হঠাৎ করেই হাঁটু ও হাতের এক্স-রে করাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা, দলের সিনিয়র নেতারা তার সঙ্গে দেখা করেন। তখন বিএনপি দাবি করেছিল- খালেদা জিয়াকে জোর করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। চিকিৎসার কিছুই হয়নি। শুধু হেনস্থা ও হয়রানি করা হয়েছে। মেডিকেল চেকআপ শেষে দুপুরে তাকে ফের কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন মামলার হাজিরা দিতে আদালতে যাননি খালেদা জিয়া। যার কারণে পুরনো কারাগারের একটি কক্ষে খালেদা জিয়ার বিচারের জন্য অস্থায়ী এজলাস বসানো হয়। সূত্র জানায়, কারাগারে খালেদা জিয়া শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট, চোখ ও হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন। সেই সঙ্গে ডায়াবেটিসের কারণে তার চোখের সমস্যা হচ্ছে। গত বছরের ৫ জুন কারাগারে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এমন অবস্থায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করাতে সরকারের কাছে একাধিকবার দাবিও জানায় বিএনপি। কিন্তু সে দাবি পূরণ হয়নি। অন্যদিকে ধীরে ধীরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরিবার ও দলের নেতাদের দেখা পাওয়ার অনুমতি কমে আসে। বিএনপির অভিযোগ, বন্দিদের আইনসম্মত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তিনি। গত ১৬ জুন রোজার ঈদের দিন দলের সিনিয়র নেতারা কারাগারে তার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করার অনুমতি না পেয়ে কারাফটক থেকে ফিরে আসেন। ৫ সেপ্টেম্বর কারাগারের ভেতরে অস্থায়ী আদালতে হাজিরা দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আপনাদের যত দিন ইচ্ছা, যত ইচ্ছা সাজা দেন। আমি বার বার আসতে পারব না। আমি অসুস্থ। আমি পা নাড়াতে পারি না। ডাক্তার আমাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। ৬ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে ফের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালেই সাব জেল ঘোষণা করে তাকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করানো হয়। এক মাস দুই দিন পরে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল জানিয়ে খালেদা জিয়াকে আবারো কারাগারে নেয়া হয়। এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকটি সমমনা দলকে সঙ্গে নিয়ে ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপি। ওই দিন সংবাদ সম্মেলন করে সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনসহ ৭ দফা দাবি জানায় ঐক্যফ্রন্ট। এসব দাবি সরকার আমলে না নেয়ায় খালেদা জিয়াকে ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে বিএনপির হাইকমান্ড। এ নিয়ে তারা দফায় দফায় বৈঠক করে। এই ইস্যুতে দুটি পক্ষ সরব হয়ে ওঠে দলের ভেতরে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একান্তে দেখা করেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। তার অনুমতি নিয়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ১১ নভেম্বর নির্বাচনে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় বিএনপি। এরপর ১২ নভেম্বর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির পাঁচ সিনিয়র নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। খালেদা জিয়াও তাদের দিকনির্দেশনা দেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নির্বাচনের মাঠে নামে দলটি। কারাগারে থেকেই ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ এই তিনটি আসনে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন খালেদা জিয়া। কিন্তু দুর্নীতি মামলায় দ-প্রাপ্ত হওয়ায় নির্বাচন কমিশন তিন আসনেই তার মনোনয়ন বাতিল করে। সূত্র জানায়, বিশাল আয়তনের কারাগারে অধিকাংশ সময় খালেদা জিয়া শান্ত ও চুপচাপ থাকেন। কারা কর্মকর্তাদের কাছে তিনি কোনো চাহিদার কথা জানান না। কিছু লাগবে কিনা- এ বিষয়ে কারা কর্মকর্তারা খোঁজ নিতে গেলে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে জানাব। প্রথম শ্রেণির একজন বন্দি ১৫ দিনের পরিবর্তে ৭ দিনে একবার চিঠি লেখার সুযোগ রয়েছে। তবে গত এক বছরে তিনি কাউকে কোনো চিঠি লেখেননি। এক বছরের কারাজীবনে পরিবারের স্বজনরা কয়েক দফা তার সঙ্গে দেখা করেছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এককভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। এ ছাড়া তার আইনজীবীরা কারাগারে কখনো দেখা করেছেন, কখনো দেখা পাননি। তার মুক্তির বিষয়ে বর্তমানে দলীয় নেতাকর্মীরা রয়েছেন ধোঁয়াশায়। কেউ বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পাবেন তিনি। আবার কেউ বলছেন, মুক্তির জন্য গড়ে তুলতে হবে দুর্বার আন্দোলন।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)