ছবির ক্যাপশন:
মেহেরপুর জেলা বিএনপি’র সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের মুখপাত্র তিনি। বর্ণাঢ্য ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন, সমসাময়িক ভাবনা এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছেন সময়ের সমীকরণ-নির্বাচনী সমীকরণ সরাসরি সাক্ষাৎকারে। এসএম শাফায়েত
কেমন আছেন?
মাসুদ অরুন: ভালো আছি বলতে পারছি না। কারণ, আমরা এক সংকটকাল অতিক্রম করছি। আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে কঠিন সময়ে এসে দাড়িয়েছি। সেই অর্থে- আল্লাহ তা’আলার অশেষ রহমতে বেঁচে আছি।
দলীয় মনোনয়ন পেয়ে অনুভুতি কেমন?
মাসুদ অরুন: মনোনয়ন আসলে একটি ব্যক্তিই পায়। কিন্তু যোগ্য প্রার্থী আরো অনেকেই আছেন। মনোনয়ন পেয়ে দেশনেত্রীর প্রতিনিধিত্ব করার কঠিন দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। এই নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা আমার কাছে আন্দোলনের সামিল। আমি মেহেরপুরের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করতে চাই।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি কেমন?
মাসুদ অরুন: মেহেরপুর জেলা বিএনপি’র ঘাঁটি বলে পরিচিত আপনারা জানেন। মাওলানা ভাষাণীর সময়কাল থেকে এই অঞ্চলে বিএনপি’র শিকড় পতিত করেন আমার পিতা মরহুম আহাম্মদ আলী। অজ¯্র বার নির্বাচনের লড়াইয়ে এই দল টিকে ছিলো। সে ক্ষেত্রে এবারের নির্বাচনে আমার ধারণা- জনগণের ইচ্ছার যদি প্রতিফলন ঘটে, সেই পরিবেশের যদি উদ্ভব হয় তবে ধানের শীষের বিজয় হবে।
মেহেরপুর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত তিন বারের সংসদ সদস্য, ভাষা সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহাম্মদ আলীর যোগ্য উত্তরসূরী মাসুদ অরুন। পিতার বর্ণাঢ্য পরিচয় বুকে ধারণ করে দেশ ও জনগণের সেবার ব্রত নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।
পিতার কী স্বপ্ন ছিলো আপনাকে নিয়ে?
মাসুদ অরুন: আমার পিতার সমগ্র রাজনৈতিক জীবন ছিলো খেঁটে খাওয়া মানুষকে নিয়ে। আমার পিতার রেখে যাওয়া দল শহীদ জিয়ার আদর্শের বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ও তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারলেই সেই স্বপ্ন পূরণ হবে।
আপনার পিতার একটি স্লোগান ছিল- `ক্ষেতে কৃষাণ, কলে মজুর; জোট বাঁধো, তৈরি হও`। আপনার স্লোগান কী?
মাসুদ অরুন: ‘রক্ত দিয়ে শোধিব ঋণ, ধানের শীষে ভোট দিন’।
আপনি তো কবিতা ও গল্পও লিখেছেন অনেক। এখনও সুযোগ পেলে লেখালেখি করেন। এত ব্যস্ততার মধ্যে কী ভাবে সম্ভব হয়?
মাসুদ অরুন: আমি চেষ্টা করি। আমি ব্যক্তিগত জীবনে একা মানুষ। আমার বাবা-মা দু’জনে আজকে নেই। আমি জনগণের মাঝে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমার কাছে থাকা মানুষগুলো গভীর রাতে যখন তাদের ঘরে ফিরে যাই, তখন আমি অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে বাড়িতে ফিরি। এরপর আমি চেষ্টা করি দু’এক কলম লেখার। আমার সম্প্রতি একটি কবিতার দু’টি লাইন বলতে চাই- ‘বুলেটে পেতেছি বুক, ভয় নেই কিছু হারাবার, লড়াই লড়াই মুক্ত করো, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।
রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পেলেন কীভাবে?
মাসুদ অরুন: আমার প্রথম অনুপ্রেরণা আমার পরিবার। জন্মের পর থেকেই দেখেছি আমার বাবা এতদাঞ্চলের মেহনতি মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছে। আমি লেখাপড়ায় খুব বেশিদূর অগ্রগতি অর্জন করতে পারি নাই। এটা আমার দুঃখ নয়। আমি যে কাজটিতে সবচেয়ে বেশি আনন্দবোধ করি- আমার পিতা যে জনগণের জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন সেই সংগ্রামের একজন কর্মী হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি।
এমন কোন স্বপ্ন আছে কী যা আপনাকে ঘুমাতে দেয় না?
মাসুদ অরুন: আমি একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু জনগণের জন্য এখনও অনেক কিছু করা বাকী রয়েছে। সেই অসমাপ্ত কাজগুলো শুরু করতে চাই। যতদিন বেঁচে আছি খেঁটে খাওয়া কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই।
জীবনটা আসলে আপনার কাছে কী?
মাসুদ অরুন: জীবন অন্যের প্রতি উৎসর্গ করতে পারাটা একটা ব্যাপার। আমাদের ধর্মে আছে- কেউ যদি তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, সেই সুযোগটা যদি তুমি গ্রহণ না করো, তাহলে তুমি দুর্ভাগ্যবান। মানুষের সহযোগিতায় পাশে, বিপদে আপদে, কষ্টের কাছে সহানুভুতি নিয়ে যদি দাড়াতে পারি এটাই আমার রাজনীতির প্রধানতম বিষয়। এর বাইরে আর কিছু চাই না। আমার পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। গাড়ী-বাড়িতে আমরা অনেক বেশি বিত্তশালী হতে পারি নাই। কারণ, জনগণের অর্থ লুন্ঠন করে নিজের সম্পদ আহরণ কখনই আমার পরিবারের আদর্শে ছিলো না।
আপনার এই শৈল্পিক চুল ও গোঁফ নিয়ে লোকমুখে অনেক কথা শুনেছি। আপনার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই-
মাসুদ অরুন: আমি প্রথমে একজন মুসলমান। আমার প্রথম আনুগত্য মহান আল্লাহ পাকের প্রতি। মেহেরপুরের এই অঞ্চলজুড়ে অনেক পন্ডিতের জন্ম হয়েছে। এরমধ্যে- রবীন্দ্রনাথ, লালন, মীর মোশাররফ, মুন্সী জমির উদ্দীনদেরকে স্মরণ করি। এই অঞ্চলের মাটি খুব উর্বর। এ ছাড়াও আমার এই অঞ্চলে একটি বাউল প্রবণতা ও মনভঙ্গি রয়েছে। তারই একটি প্রভাব আমার উপর পড়তে পারে। তবে ধর্মের প্রতি যথেষ্ট আনুগত্য রয়েছে আমার। একটি স্মৃতি- একদিন ঢাকা রমনা পার্কে একটি বাউলের অনুষ্ঠানে গিয়েছি আমি। আমাকে অনেক মানুষ ঘিরে ধরেছে। সবাই জানতে চাই- ভাই আপনি কখন গান গেতে উঠবেন। এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। আমি এর থেকে বেশি আনন্দ পাই- যখন আমি গ্রামে যায়, তখন অল্প বয়সী বাচ্চারা আমাকে ঘিরে ধরে। মাইলের পর মাইলের আমার চলার সঙ্গী হয় ওই বাচ্চারাও। গ্রামের মহিলারা দূর থেকে টুঁকি দিয়ে দেখে, ওই যে মাসুদ অরুন এসেছে।
দলের কঠিন দুঃসময়ে আপনার নেতৃত্বে মেহেরপুর জেলা বিএনপি সুসংগঠিত ছিলো এবং এখনও রয়েছে বলে জানি। কী ভাবে সম্ভব হয়েছে?
মাসুদ অরুন: পেশায় আমার রাজনীতি। এটা নেশার কোন ব্যাপার নয়। জনগণের সঙ্গে থাকে একটি পেশা, তবেই জনসম্পৃক্ততা বেশি থাকে। আমি যদি ব্যবসায়ী হতাম, চাকরী করতাম তবে একটু কষ্টসাধ্য হতো। আমি ব্যবসা ফেলে চাকরী ছেড়ে রাজনীতি করতে আসলে বিষয়টি অন্যরকম। আর যখন জনগণই নেতাকে পরিচালনা করে তখন নেতা জনগণের সঙ্গে সবসময় থাকবে। আমার বড় পাওয়া- আমার প্রতিদিনের ব্যয়ভার বহন করে জনগণ। তাই আমি সব সময় জনগণের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করি। এ ভাবেই মেহেরপুর জেলা বিএনপি সুসংগঠিত হয়েছে আর এখনও রয়েছে।
বর্তমানে মামলার সংখ্যা কত?
মাসুদ অরুন: অসংখ্যা, অগণিত।
নির্বাচনের প্রতিকূল পরিস্থিতি স্বত্ত্বেও এই নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনের পরিবেশ কেমন মনে করছেন?
মাসুদ অরুন: সারাদিন আমাকে জনগণের কাছে থাকতে হয়। রাতে ফোনের পর ফোন ধরতে হয়। এই শুনি পুলিশ এসেছে, কাউকে ধরে নিয়ে গেলো। শুধু তাই নয় একজন সাধারণ কৃষক, দোকানী, দিনমজুরও ছাড় পাচ্ছে না। তাদের কী দোষ। ধানের শীষে ভোট দিতে চাই, মাসুদ অরুনকে ভালোবাসে বলে কারাগারে যেতে হচ্ছে তাদের। আবার এই একটি বিশেষ বাহিনী নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইছে বলেও অভিযোগ আছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভোটের পরিবেশ তৈরি করে নিতে চাই। আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো। রাতের ভোট দিনে হবে না, দিনের ভোট রাতে হবে না। এই কথা শুনে অনেকের গায়ে জ্বালা ধরে গেছে, কিছুতেই তারা মেনে নিতে পারছে না। ১০ বছরে এত উন্নয়নের ঢাকঢোল পেটানোর পরেও সরকার দলীয় বাহিনী এখন প্রচার করে, ‘যদি ভোট না দাও তবে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেবো, তোমাদের তালিকা পুলিশের হাতে দিয়ে দেবো।’। তাই বলতে চাই- নির্বাচনের সমতল ভূমি এখনও তৈরি হয়নি।
নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী?
মাসুদ অরুন: মানুষ যদি আমাকে ভালোবাসে তবে বিজয়ী হওয়া সম্ভব। কিন্তু সে বিজয় হবে জনগণের। আমার মধ্যদিয়ে যেন জনগণের বিজয় দৃশ্যমান হয়। ভোটাররা তাদের ভোটটি স্বতস্ফুর্ত ভাবে দিতে পারলেই আমার বিজয় হবে।
নির্বাচনে বিজয়ী হলে কী করতে চান মেহেরপুর-১ আসনবাসীর জন্য?
মাসুদ অরুন: ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মেহেরপুর গার্লস কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এখানে আরও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। মেহেরপুরের প্রতিটি রাস্তায় বিএনপি’র সময় উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমান সাংসদ, আমার ছোট ভাই দোদুলকে বলেছি, ‘নতুন কিছু করার দরকার হবে না। আমরা যা করেছি তা শুধু সংস্কার করো’। এবার আমি নির্বাচিত হলে এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করার ইচ্ছে আছে, আমরা ভৈরব নদী শুধু খনন নয় ‘ভৈরব সেচ প্রকল্প’ হাতে নিতে চাই, মৎস্য খামার করে মেহেরপুর থেকে সারাদেশে সরবরাহ, মেহেরপুর স্থল বন্দর বাস্তবায়ন এবং মেহেরপুরে রেলপথ সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ কার্যকর করতে চাই।
নির্বাচনে বিজয়ী হলে কী করতে চান মেহেরপুর-১ আসনবাসীর জন্য?
মাসুদ অরুন: ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মেহেরপুর গার্লস কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এখানে আরও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। মেহেরপুরের প্রতিটি রাস্তায় বিএনপি’র সময় উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমান সাংসদ, আমার ছোট ভাই দোদুলকে বলেছি, ‘নতুন কিছু করার দরকার হবে না। আমরা যা করেছি তা শুধু সংস্কার করো’। এবার আমি নির্বাচিত হলে এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করার ইচ্ছে আছে, আমরা ভৈরব নদী শুধু খনন নয় ‘ভৈরব সেচ প্রকল্প’ হাতে নিতে চাই, মৎস্য খামার করে মেহেরপুর থেকে সারাদেশে সরবরাহ, মেহেরপুর স্থল বন্দর বাস্তবায়ন এবং মেহেরপুরে রেলপথ সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ কার্যকর করতে চাই।
