ছবির ক্যাপশন:
সেনা নামবে ১৫ ডিসেম্বর
অহেতুক বদলি না করার দাবি পুলিশের * বিনা কারণে নেতাকর্মীদের হয়রানি না করার নির্দেশ * দন্ডিতদের বিষয়ে গ্রেফতারে আপত্তি নেই ইসির
ডেস্ক রিপোর্ট: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১৫ ডিসেম্বরের পর থেকে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে থাকবে। তারা পুলিশ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচনী এলাকা রেকি করবেন। তবে, নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে ভোটের আগে-পরে ১০দিন। এর মধ্যে ভোটের আগে সাত দিন, ভোটের দিনসহ পরে তিন দিন। কিন্তু বিচারিক ক্ষমতা নয়, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বিশেষ এ বাহিনী। তারা জেলা ও উপজেলা সদরে ক্যাম্প করে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন। গতকাল নির্বাচন ভবনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষ সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা এ কথা জানান। এতে পুলিশ সুপার থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তরা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সিইসি কে এম নুরুল হুদা। দলমত নির্বিশেষে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাস্তানদের তালিকা তৈরি করে তাদেরকে নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠকে নির্বাচনের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণ, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতিসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো উঠে আসে। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ডেকে নির্বাচন বিষয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছিল ইসি। প্রতীক বরাদ্দের পর সমন্বিত একটি আইনশৃঙ্খলা বৈঠক করবে কমিশন। ওই বৈঠকে রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বরিশাল ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাদের ভূমিকা তুলে ধরেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি সরকারি দলের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সম্ভব। বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, বেশিরভাগ কর্মকর্তার বক্তব্যে বদলির বিষয়টি উঠে এসেছে। তারা বলেছেন, নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করলে একটি পক্ষ বারবারই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। এসব অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ছাড়া যেন কাউকে বদলি করা না হয়। বৈঠকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার ওসিকে বদলির ঘটনায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আরো জানা গেছে, বৈঠকে পুলিশের আইজি ইসিকে বলেছেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আপনারা যে দায়িত্ব দেবেন তা নিরপেক্ষভাবে আমরা পালন করব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব বলেন, নির্বাচনে আমাদের সব বাহিনী তৎপর আছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও র্যাবের টিমগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, নির্বাচনে যেন কোনো অনিয়ম না হয় সে বিষয়ে আমরা সর্বদা সতর্ক থাকব। তবে নির্বাচন ভুল করার জন্য যেসব দুষ্কৃতকারী, সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে না পারে সে জন্য পুলিশ কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করবে। বৈঠকে একজন পুলিশ সুপার বলেছেন, এই নির্বাচনে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি মাঠে নেমেছে। এদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ইসির নির্দেশনা চেয়েছেন তিনি। আরেকজন পুলিশ সুপার বলেছেন, চলমান অভিযান বন্ধ করা হলে বিভিন্ন মহল মাঠে নামবে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আরেক পুলিশ সুপার বলেছেন, যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা রয়েছে তাদেরকে নির্বাচনের নামে মার্সি করা যাবে না। এ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলার আসামি গ্রেফতার করা হলে ইসির আপত্তি থাকবে না। এটা আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদেরকে অযথা হয়রানি করা যাবে না। বৈঠকে আরেক পুলিশ সুপার বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে বৈধ অস্ত্র থানায় জমা দেওয়া লাগবে না। ভোটের দিন যাতে এসব বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন না করে সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বৈঠকে বলেন, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নেই। তবে তাদের নিরাপত্তায় এক-দুজন পুলিশ সদস্য থাকবেন।
বৈঠকে ১২ দফা নির্দেশনা সিইসির : বৈঠকে সিইসি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। পুলিশ কর্মকর্তাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আপনাদের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আপনাদের নৈমিত্তিক কাজে হস্তক্ষেপ করব না। আপনাদের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতার প্রতি নজরদারি করব। যদি কারো অদক্ষতা অথবা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরিস্থিতি দেখা দেয় তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুবার চিন্তা করব না। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের ১২ দফা নির্দেশনা দেন সিইসি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নির্বাচনী কর্মকর্তাদের তালিকা ধরে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করতে হবে। এতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মধ্যে নাশকতাকারী সৃষ্টিকারী রয়েছে কী না সেটা দেখতে হবে। বিনা কারণে কোনো ব্যক্তির নামে হয়রানিমূলক মামলা করা বা গ্রেফতার করা যাবে না। প্রত্যেক এলাকার দলমত নির্বিশেষে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাস্তানদের তালিকা তৈরি করে নজরদারি করতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনী কোথায়, কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করতে হবে। হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার ভোটকেন্দ্রের মাল পরিবহন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের যাতায়াতের জন্য বিশেষ যানবাহনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
গাজীপুর-বরিশালের মতো নির্বাচন নয়- মাহবুব তালুকদার : বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার চার পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পড়েন। পুলিশের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি গাজীপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের কার্যক্রমও তুলে ধরেন। এ দুই নির্বাচন নিয়ে ইসির ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনও উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা না পালন করলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এ কমিশনার বলেন, সরকার যদি সরকারি দলের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সম্ভব। ইসির পক্ষে এককভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সম্ভব নয়। তবু আমি মনে করি, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পুলিশের একটি বিরাট ভূমিকা আছে। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে পুলিশের বিরাট ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সিইসি ছাড়াও সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, অতিরিক্ত সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, আইজিপি, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
