ছবির ক্যাপশন:
মেহেরাব্বিন সানভী: জিয়াউদ্দীন আহমেদ সদ্য বিদায়ী চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক। জনবান্ধব প্রশাসন গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করতে এসে খুব অল্প সময়ে এ জেলায় পরিচিতি পেয়েছিলেন একজন জনবন্ধু হিসেবে। গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদের ছিলো চুয়াডাঙ্গায় জেলা প্রশাসক হিসাবে শেষ কর্মদিবস। কারণ আজ তিনি নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে এ জেলা ত্যাগ করবেন। প্রতিদিনের ন্যায় গতকালও পার করেছেন ব্যস্ত সময়। তবে একটু ভিন্ন। কারণ, প্রতিদিন কাজ করতেন চুয়াডাঙ্গার জন্য। গতকয়েকদিন বিদায় বেলায় চুয়াডাঙ্গার জন্য কাজ করার পাশাপাশি তিনি চুয়াডাঙ্গার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। আগেও ভালোবাসা পেয়েছেন। এই ভালোবাসাটা কেমন তা জানি না! তবে এ জেলার মানুষ তথা আমরা বোধহয় চেয়েছিলাম একটু বেশিই সময় নিতে। কিন্তু পাইনি। তিনি তার কর্মব্যস্ততার কারণে অন্য সময় যেভাবে আমাদেরকে সময় দিয়েছেন, বিদায় বেলায় বিদায় শুভেচ্ছা নেওয়ার সময় হয়ত তা দিতে পারলেন না। তবে জেলাবাসীর জন্য এটা বোধহয় একটু দু:খের নয়, দু:খ হোক কিংবা যায় হয়, সেটা তো এটাই তিনি চাকুরি সূত্রে আমাদের চুয়াডাঙ্গা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
কি মুশকিল, বলতে বলতে কোথায় যেন চলে গেলাম, যাইহোক, দিনটি বোধহয় ২০১৭ সালের ১২ মে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক সায়মা ইউনুস বদলিজনীত কারণে চুয়াডাঙ্গা ছেড়ে ঢাকায় চলে গেলেন। নবাগত জেলা প্রশাসক হিসাবে জিয়াউদ্দীন আহমেদের আগমন হলো। প্রথম তাকে দেখলাম ২০১৭ সালের ১৩ মে তারিখে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে। একটু অবাক হয়েছিলাম, কথাবার্তা শুনে ভালো লেগেছিল, আবার একটু কেমন যেন লাগছিলো। ডিসি বিটে কাজ করি, দেখে তো মনে হলো নতুন জেলা প্রশাসক বিরাট কড়া মানুষ। একটি পত্রিকার নিউজে বোধহয় নামের বানান ভুল করেছিলো। ওখানেই তিনি তাদের উদ্দেশ্যে নামের বানানের বিষয়ে সতর্ক হতে বলেছিলেন। আবার মতবিনিময় প্রায় শেষ তখন হঠাৎ একজন সাংবাদিক একটা প্রশ্ন করে বসল, তখন তিনি উত্তর না দিয়ে বলেছিলেন, প্রটোকল ভাঙ্গা যাবে না। বুঝলাম তিনি শক্তও বটে। ভালো লেগেছিল, যখন তিনি বললেন আমি চুয়াডাঙ্গায় থাকতে আসিনি। সরকার যেখানে দেবে সেখানেই কাজ করবো। যাইহোক, তার কথাগুলো শুনেই বুঝেছিলাম, মানুষটা খারাপ নয়। তবে, শিশু সাংবাদিক হিসাবে কাজ করতে যেয়ে বেশি ভালো তখন লেগেছিল, যখন তিনি নামটি জিজ্ঞাসা করে একবার শুনেও এখনো মনে রেখেছেন। আসলে পিচ্চি তো সবাই তেমন গুরুত্ব দিতো না, এটা একটু ব্যাতিক্রম। অবশ্য এটা তাঁর একটি ভালো গুণও বটে, নাম ধরে ডাকার চেষ্টা করেন। সবার নাম মনেও রাখেন। দাদুর কাছে শুনেছি, কালেক্টর। বাব্বা, সে তো বিরাট কথা। জেলার যে সব থেকে ধনী, সেও যে তার কাছে কুর্নিশ করে কথা বলে। সে শাসক। যাইহোক তাঁর আন্তরিকতাটা বেশ ভালো ছিলো। সেই কালেক্টর নাম ধরে ডাকছে!
ভালো তখন লেগেছিল, যখন তিনি শিল্পকলার এক অনুষ্ঠানে প্রথম বললেন তিনিও এক সময় সাংবাদিকতা করেছেন। এই দাবিটা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রতি তার একটা আলাদা দাবি আছে। ভালো তখন লেগেছিল, যখন তিনি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, উপস্থিত সবাই তো আমরা। নাস্তা কম তাতে কি হয়েছে, ভাগ করে খাই! ভালো তখন লেগেছিল, যখন তিনি কথা বলতেন, গুছিয়ে এবং সবার থেকে ভিন্ন কথাগুলো বলতেন। বক্তব্যের সময়, পজিটিভ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে ভালোবাসেন। ভালো তখন লেগেছিল, যখন ডিসি অফিসের নিচে বসে থাকা ভিক্ষুকটির সাথে কথা বলে পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করাটা দেখে। ভিক্ষুকমুক্ত চুয়াডাঙ্গা করতে এক ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে যখন তিনি কাজ করে চুয়াডাঙ্গাকে ভিক্ষুকমুক্ত করলেন। তাকে তখন অন্য মানুষগুলোর থেকে ব্যাতিক্রম মনে হয়েছিল, যখন তিনি সেই বাচ্চাগুলো যারা সারাদিন ভার্চুয়াল জগতে পড়ে থাকতো। মোবাইল, প্রাইভেট, স্কুল-কলেজ আর বাড়ী ছাড়া কিছুই চিনে না তাদের সাথে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযান পরিচালনা করলেন। তাকে তখন একজন ক্রিড়া ব্যক্তিত্ব বা সংগঠক মনে হয়েছিলো, যখন ডিসি অফিসে দীর্ঘদিন যাবৎ পড়ে থাকা একটি গোল্ডকাপ দেখে এতবড় একটা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করলেন, যা দেখে শুধুমাত্র চুয়াডাঙ্গাবাসী নয়, পুরো বাংলাদেশের মানুষ অবাক হলো। ভালো তখন লেগেছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আমাদের মত যুবকদের দিয়ে পুরো চুয়াডাঙ্গায় ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যখন। ও এবারও তো ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক পরিবেশ পদকের। তিনি সর্বদা মনে করতেন বাচ্চাদেরকে ভালো মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।
তাইতো, স্কুলে স্কুলে সততা স্টোরের মত এক ব্যতিক্রমি স্টল চালুর জন্য তাগিদ দিলেন। সফলতা তো আসবেই। দৃষ্টান্ত তো তখন স্থাপন করলেন যখন একযোগে সাড়ে সাত লক্ষ বৃক্ষরোপণ করলেন। আজ না হয় কাল তার উদ্যোগে রোপণকৃত বৃক্ষ তো ফল দেবেই। চুয়াডাঙ্গার মানুষ তখন বুঝবে যখন তার রোপণকৃত তাল বীজ থেকে বের হওয়া গাছের ফল পাবে চুয়াডাঙ্গার মানুষ। কি মুশকিল শুধু কি তাই বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যায় তো কমবে। উপকৃত তো চুয়াডাঙ্গার মানুষ ১০০ বছর পরেও হবে। চুয়াডাঙ্গার মানুষ তো তাকে নিয়ে গর্ব তখন করলো মাত্র দেড় বছরেরও কম সময়ে চুয়াডাঙ্গায় কর্ম দিবসে যখন তিনি চুয়াডাঙ্গার প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক হিসাবে ডিসি সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করলেন। যখন, তার দেওয়া প্রস্তাবে প্রত্যেকটি জেলায় হবে মিনি সচিবালয়। যখন তার করা আবেদনে চুয়াডাঙ্গা সি গ্রেড থেকে বি গ্রেডে উন্নীত হলো। ভিন্নধর্মী তো সেটা ছিলো, যখন তিনি ক্লাস ফাকি দিয়ে পার্কে যাওয়া বন্ধে পার্কগুলোতে অভিযান পরিচালনা করলেন। কোচিং সেন্টার বন্ধে নিলেন ভিন্ন উদ্যোগ। করে গেলেন জেলা ব্র্যান্ডিং। সারাদেশেই ডিসি অফিস আছে। কিন্তু একটু ভিন্ন কথা ভেবে নিজ উদ্যোগে ছাদ বাগানে করে বসলেন ছাদ বাগান। আবার জাতীয় পর্যায়ের পুরষ্কার নিয়ে আসলেন চুয়াডাঙ্গার জন্য। আগের ডিসির সময় যেখানে বাল্যবিবাহে দ্বিতীয় চুয়াডাঙ্গা। সেখানে এখন বাল্যবিবাহ প্রায় বন্ধ। দেশের সর্বপ্রথম বন্যপ্রানি ও পাখির মুক্ত অভয়ারণ্য হিসাবে চুয়াডাঙ্গাকে ঘোষনা করার জন্য কাজ করাটাও কম নয়। চুয়াডাঙ্গাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত করা জন্য উদ্যোগ নেওয়াটা সফল বটে। পরিক্ষা কেন্দ্র, স্কুল ও কলেজে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়াটাও বেশ ভালো। সরকারি অনুদান হলেও শীতে গভীর রাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি যেয়ে কম্বল বিতরণ করাটা ব্যাতিক্রম তো বটেই। সত্য কথা ভূমি দেখার জন্যই তো কালেক্টর বাহাদুর বা ডিসি পোস্টের জন্ম। এখন তো সেই ভূমির কোথাও কোথাও বেদখল। দখল হয়ে থাকা সরকারি জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়াটা যদিও তার কাজ তবে সেই কর্তব্য রোধ থেকে আর যেন দখল না নয়, সেটা দেখা কিংবা উদ্ধার করার ব্যাপারটির দিকে নজর দেওয়া এটাও তো কাজ করার মানসিকতা।
কওমি মাদ্রাসায় কম বাচ্চা পড়ে না। তবে সেখানে শেখানো হয় না জাতীয় সংঙ্গীত, তোলা হয়না জাতীয় পতাকা আবার সমাবেশও তো হয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কওমি মাদ্রাসাগুলোর সাথে বসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনসহ সমাবেশের জন্য জোর দিয়ে রাজি করানোটাও বেশ জাতীয় স্বার্থের। দীর্ঘদিনের যানযটের সমস্য থেকে উত্তরণের জন্য চুয়াডাঙ্গা হাসপাতাল রোডের একমূখি চলাচলের ব্যবস্থাটা খারাপ নয়। উদ্যোগটা প্রসংশনিয়। কি মুশকিল ভুলেই তো গেছি, এখন আর চুয়াডাঙ্গার কোনে মেলায় মেলায় উঠাও বাচ্চা লটারি হয় না। চুয়াডাঙ্গায় বাড়ী আর রেল গেটের সামনে যানযটে পড়া কিংবা গেট পড়লে দাড়িয়ে থাকেনি এমন কেউ নেই। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘ দিনের বন্ধ হয়ে থাকা চুয়াডাঙ্গা রেল গেটের আন্ডারপাস সড়কটি চালু করাটাও চুয়াডাঙ্গাবাসীর জন্যই। যাইহোক, চুয়াডাঙ্গাবাসীর প্রিয় জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদের চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক হিসাবে শেষ কর্ম দিবস ছিলো কাল। আজ জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। স্থানিয় সরকার মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব হিসাবে তিনি যোগদান করবেন। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ঢেকি স্বর্গে যেয়েও ধান ভানে। কর্মঠ জিয়াউদ্দীন আহমেদ যেখানেই যাবেন, সেখানেই দেশের জন্য কাজ করবেন এই কামনা থাকবে।
