ছবির ক্যাপশন:
অংশুমান না অন্ধকারের পথে যাত্রা হবে অক্টোবরে?
-হারুন-উর-রশিদ
একাদশ জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বিবেচনায় নিলে, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর নির্বাচনের অনন্ত ৯০ দিন আগে তফসিল ঘোষণার নিয়ম। তাই আসছে অক্টোবর মাস জটিল সব সমীকরণ নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছে। ৩০ অক্টোবরের পর থেকেই নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হবে। বর্তমান অবস্থার কোন নাটকীয় পরিবর্তন না হলে নির্বাচনকালীন সরকার শপথ নিবে অক্টোবর মাসে। এখন প্রশ্ন হলো আসছে অক্টোবরে আমরা আলোর পথে যাত্রা করবো না অন্ধকারে নিমজ্জিত হবো। দু’টির যেকোন একটি সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশের যে কাউকে জিজ্ঞাসা করেন দেশের রাজনীতির হালচাল কী? সে আপনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা বিচার বিশ্লেষণ করে শোনাতে পারবে। তবে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আসন্ন নির্বাচন কিভাবে হবে? সব দল কী অংশগ্রহণ করবে তাতে? সব নাগরিক কী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে এবার? এর কোন সদুত্তোর সে দিতে পারবে না। এটা গ্রামের দিনমজুর থেকে শহরের বুদ্ধিজীবী কেউই না। আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে কী হতে চলেছে। সবার উত্তর মোটামুটি একই ধরণের, দেখা যাক কী হয়। বর্তমান এই পরিস্থিতিই দেশের রাজনীতিতে ব্লাকহোলের জন্ম দিয়েছে। সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান সম্প্রতি তার একটি লেখায় জাতির কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, নির্বাচন হবে, গণতন্ত্র বাঁচবে তো? রাজনীতির মাঠে আর যে প্রশ্নটা বারবার আলোচিত হচ্ছে, বিএনপি এবারও নির্বাচনে না এলে কী হবে? তা হয়তো ভবিষ্যত বলবে। অবশ্য নির্বাচনে আসা ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্পও নেই। এবার নির্বাচনে না এলে দল হিসেবে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। ফলে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকতে তারা আবার নিবন্ধন ফিরে পাবে এ কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। নিবন্ধন ফিরে পেলেও দল থেকে জিয়া পরিবার যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এ কথা বলার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। সরকার অবশ্য তার সর্বশক্তি ও বিএনপির একটা অংশকে কাজে লাগিয়ে চাইবে খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসে। তবে অবস্থা দৃষ্টিতে যা মনে হচ্ছে দলটি যেকোন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে আসবে। এ কথা বুঝতে পেরে সরকার সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধরপাকড় ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া ইতোমধ্যে নতুন করে শুরু করেছে।
অপরদিকে, যেখানে মামলা-হামলায় বিরোধী দল কোথায় পালায় ঠিক সেসময় ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান সাংসদগণ ও নতুন মনোনয়ন প্রত্যাশীগণ রাজনীতির মাঠ গরম করে রেখেছেন। এককথায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হলো, আওয়ামী লীগ ভোটে আর বিরোধীরা কোর্টে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি, জাতীয় ঐক্য বা যুক্তফ্রন্ট নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যে রাজনীতি বোঝে ও করতে জানে তার পরিচয় দিচ্ছে জাতীয় যুক্তফন্ট নিয়ে এই দলটির ঐক্য-ঐক্য খেলা। প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভে ড. ও ডা. রা এই বৃদ্ধ বয়সে ছুটে বেড়াচ্ছেন! দেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, সরকারের সমালোচনা করছেন। যা বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে সরব হবার সুযোগ করে দিয়েছে। ঐক্য-ঐক্য খেলাকে বিএনপি পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যস্ত।
তবে পর্দার আড়ালে আর যে বিষয়টি চলছে তাহলো, দেনদরবার ও দৌড়ঝাপ। একদফা ভারতে দৌঁড়ঝাপ শেষ করে আমাদের রাজনীতিবিদগণ জাতিসংঘেও দৌঁড়ঝাপ সেরে ফেলেছেন। আরেকদফা হয়তো ভারতমুখী দেখা যাবে সবাইকে। আমাদের দেশে দুটো উত্তরপাড়া আছে। একটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একটা রাজধানী ঢাকায়। রাবির উত্তরপাড়া প্রেম ও ভালোবাসার সুবাতাস ছড়ায় আর ঢাকার উত্তরপাড়া দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ায়। ঢাকার উত্তরপাড়ার এখন সুসময়। আমাদের রাজনীতিতে তারা গুরুত্ব পাচ্ছে। নিয়মিত গোপন বৈঠক হচ্ছে ওপাড়ায়- এমন ধারনা অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের।
রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের চুড়ান্ত উদাহরণ হলেন, আমাদের প্রধান দুই নেত্রী। একজন বর্তমান ও আর একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। আমাদের যত অর্জন তাদের হাত ধরেই। নারী নেতৃত্বকে সম্মানের সাথে দেখতে তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন ও অভ্যস্ত করেছেন। তবে তাদের উপর হামলা-মামলা ও রাজনীতি থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত কম হয়নি। ওয়ান ইলেভেনের সময় মাইনাস-টু ফরমূলা বাস্তবায়ন করার খুব চেষ্টা করা হয়েছিল। এদেশের রাজনীতি পাগল জনগণ তা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। তবে চক্রান্ত থেমে থাকেনি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য পরবর্তীতে আমরা দেখলাম, তাদের একজনকে দিয়ে আরেকজনকে রাজনীতি থেকে মোটামুটি মাইনাস করে দেওয়া হলো। গত দশ বছর বেগম খালেদা জিয়া কার্যত রাজনীতি থেকে মাইনাস হয়ে আছেন। মজা করে অনেকে বলেন, এখনতো বিএনপি ও তার নেত্রী জাদুঘরে চলে গেছেন। আর বাকী আছেন একজন!
রাজনীতির অংক যারা ভালোবাসে তাদের মাথায় জটিল যে সমীকরণটা বর্তমানে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো- মাইনাস ওয়ান এর সাথে আর একজন প্লাস হয়ে কী মাইনাসে প্লাসে জিরো হবে। নাকি প্লাস ওয়ান এর সাথে আর একজন মুক্ত হয়ে প্লাস হয়ে টু হয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসবে। যদিও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তৃতীয় কোন পক্ষের পক্ষে ক্ষমতা গ্রহণকরার দ্বার রুদ্ধকরা হয়েছে, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাজনীতির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত জটিল ও অদ্ভূত। অদ্ভূত কারণ, বর্তমান সংসদে রয়েছে অদ্ভূত ধরণের গৃহপালিত বিরোধী দল। ফলে সরকারের কাজের বিরোধিতা বা দ্বিমত পোষণ করার মতো সংসদে কেউ নেই। তাই নির্বচনকালীন সরকারেও বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না।
হিসাব জটিল কেননা, আমাদের রাজনীতিবিদদের নিজেদের মধ্যে যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তা দূর হয়নি। নির্বাচনে সূক্ষ কারচুপি, স্থুল কারচুপি, ভোট চুরি ও ডাকাতির সাথে নির্বাচনে নতুন অনুসঙ্গ হলো ‘খুলনা মডেল’। সাথে মরার উপড় খাড়ার ঘা আরেক আতঙ্কের নাম ইভিএম ।
এই অবস্থায় কী হতে চলেছে দেশে? কথায় আছে বদ্ধঘরে বন্দী বিড়াল বাঘের চেয়েও ভংঙ্কর। বিএনপি ও সরকার বিরোধীরা যদি দেখে তাদের সামনে ক্ষমতায় যাওয়ার কোন রাস্তায় খোলা নেই, তবে তারা যেকোন কিছুই করতে পারে। যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নাও হতে পারে। আবার কম গণতন্ত্র ও বেশী উন্নয়নের যে ধারণা ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়, সে পথেও হতে পারে আমাদের দীর্ঘযাত্রা।
গণতন্ত্রে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। আমাদের সংবিধান সকলের সমাধিকারের কথা বলে। তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার তার দায় কোনভাবেই এড়াতে পারে না। বিধানমতে, তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে যেহেতু ইসি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে। তাই গৃহপালিত বিরোধী দল ছাড়া বিএনপিসহ দেশের সকল বিরোধীপক্ষ তাকিয়ে আছে আসছে অক্টোবর মাসের দিকে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তারা রাজনীতির মাঠে নামবে।
অনাগত জটিল সব রাজনৈতিক সমীকরণে বন্দি সময়টা জাতি হিসেবে আমরা ভালোভাবেই পার করতে পারবো আশা রাখি। প্রত্যাশা থাকবে ইসি শক্তিশালী ভুমিকা পালন করে জাতিকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন উপহার দিতে পারবে। বর্তমান গুমোট অবস্থার পরিবর্তন হয়ে আসছে অক্টোবরেই হবে, সে পথে নবযাত্রা।
