জীবননগরে ভাল নেই আদিবাসী বুনো সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো

আপলোড তারিখঃ 2018-04-11 ইং
জীবননগরে ভাল নেই আদিবাসী বুনো সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো ছবির ক্যাপশন:
মিঠুন মাহমুদ/ এআর ডাবলু: অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করছেন জীবননগরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসী (বুনো) সম্প্রদায়। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও আজও আদিবাসী (বুনো) জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মজীবন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে লেশমাত্র পরিবর্তন হয়নি। আর এ সংকটময় জীবনযাপন যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে পড়েছে আদিবাসী (বুনো) পল্লীর মানুষের। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে ভারতের নাগারল্যান্ড রাজ্যের নাগদপুরের মালো সম্প্রদায়ের শতাধিক লোক দৌলৎগঞ্জে আসেন। লর্ড ডালহৌসির আমলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এদেশে নীল চাষের সম্প্রসারণের জন্য লাঠিয়াল বাহিনীর মাধ্যমে তাদের পূর্বপুরুষের দৌলৎগঞ্জে নিয়ে আসেন। সে সময় থেকে তারা এই উপজেলার মনোহরপুর, শাখারিয়া, সুবলপুর, পাথিলা ও শিয়ালমারী গ্রামে কয়েকটি পরিবার মিলে বসতি স্থাপন করেন। তৎকালীন ১৯৪৭ সালের দিকে অনেকেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অত্যাচারে এ দেশ ত্যাগ করে নিজ ভূমিতে ফিরে যান। সেই সময় থেকে এখনও অবদি জীবননগর উপজেলার ওই সব গ্রামে প্রায় ৩শ টি পরিবারেরও বেশি পরিবার বসবাস করে যাচ্ছে। সেই শুরু থেকে আজও দারিদ্রতার কষাঘাতে অতিকষ্টে দিনানিপাত করতে হচ্ছে এই সম্প্রদায়কে। সরেজমিনে দেখা গেছে, জীবননগর উপজেলায় বসবাসকারি বুনো সম্প্রদয়ের অধিকাংশ পরিবার নানা সমস্যায় জর্জরিত। পাটখড়ি আর পলিথিনের ছাউনী দিয়ে তৈরি দো’চালা ছাপড়া ঘরে রাতের বেলা কোন মতে মাথা গোঁজার চেষ্টা, নেই কোন স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাটিন, বিশুদ্ধ পানিসহ অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। এ সমস্ত পল্লীতে এখনও কোন আধুনিকতার ছোয়া পৌঁছাইনি। এদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৯০ জনের কোন নিজস্ব জমি। অনেকের কাগজে কলমে জমি থাকলেও বাস্তবে তাদের নামে কোন জমি নেই। এ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা খুব সহজ সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপন করার সুযোগে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা তাদের জমি দখল করে নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে আদিবাসীরা এক সময় এ অঞ্চলের জমিদার থাকলেও এখন দিন মজুর ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। এছাড়া জমিজমা হারিয়ে পথে বসেছেন অনেকে। আবার অনেকে মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে জড়িয়ে পড়েছে ঋণের জালে। আবার অনেকে অত্যাচারিত হয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। এ জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষেরা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে এক সময় বেজী, ইঁদুর, বিভিন্ন পশুপাখি, মাছ, কাঁকড়া, সাপ, খরগোশ, কচ্ছপসহ নানা ধরনের প্রাণি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এখন বন জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ায় তাদের জীবিকাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে তারা দিনমজুর, ইটভাঙ্গা, সেলুন, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রী ও গাড়োয়ানের কাজসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। দিনে ৭০ থেকে ১২০টাকা আয় করে চালাচ্ছে সংসার। অভাবের তাড়নায় বাড়ির গৃহবধূরাও পুরুষের পাশাপাশি কাজের খোঁজে ছুটে চলেছে বিভিন্ন জায়গায়। সকাল হতে না হতেই পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সংসারের কাজ শেষে বিভিন্ন কর্মস্থানে ছুটে যায় রাস্তা ঘাটে মাটি কাটা, মাঠে ধান লাগানো ইত্যাদি কাজ করে থাকে। এসব পল্লীতে ৫ থেকে ১২ বছরের শিশু আছে প্রায় দুইশত এ বয়সে যাদের চিবুড়ি, গোল্লাছুট, ইচিং-বিচিংয়ের মত খেলাসহ স্কুলে ভর্তি হয়ে শিক্ষা লাভ করার কথা থাকলেও তারা জীবিকার সন্ধানে এক ভিন্ন খেলায় মেতে উঠেছে। সকাল হতেই এসব শিশু ফসল কেটে নিয়ে যাওয়া মাঠের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান-গম সহ নানা রকমের খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে আনে। এককথায় ইঁদুরের খাবার কেড়ে খায় তারা। প্রতিযোগিতা করে কে কত খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে পারবে। রোদে পুড়ে, পানিতে ভিজে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেই তাদের খুজে নিতে হয় নির্মল আনন্দ। এ পল্লীতে প্রবেশ করতেই জীর্ণশীর্ণ দেহ নিয়ে পলিথিনের তৈরী ছাপড়ার সামনে বসে থাকা বাসন্তি চুনেবুড়ি (৪০) নামের এক নারীর সাথে কথা হলে অনেকটা কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার স্বামী মারা গেছে। ফলে অন্যের জায়গায় পাটখড়ি ও পলিথিনের ছাউনী দিয়ে বসবাস করছেন। অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে যা পায়, তা দিয়ে কোনমতে ছোট দুটি সন্তান নিয়ে চলে তার সংসার। এদিকে বিজিত ও উজ্জল নামে দুজন ক্ষোভ নিয়ে জানালেন, আমরা মানুষ না, আশপাশের বড় লোকেরা আমাগো বুনো বলে ডাকে। বিপদে সাহায্য তো দূরের কথা, আমাগোর সাথে কেউ ঠিক মত কথাও কয়তে চাই না। বর্তমান বাজারে চাল, ডালির দাম বাড়াতে আমাদের সংসার চালাতি হিমশিম খাতি হচ্ছে। এ রকম আর কয়দিন চলনি না পরে, আমাগের না খেয়ে মরা লাগবি। একই কথা জানায় সুজিত, চঞ্জল, উজ্জল, ইনা, প্রদীপ, অর্জুন, সুশান্ত, নরেশ, কালু, মেঘা সর্দার, সিদাম, ঘেনী সর্দার, ও লেবুলাল সর্দার, বিশ্বজিৎ নামের আদিবাসী দিনমজুর সদস্যরা। এ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা, কালীপূজা ও মনসাপূজা অর্থের অভাবে বেশির ভাগ সময়ই পালন করতে ব্যর্থ হয়। তাছাড়াও এদের মধ্যে এখন আধুনিকতা ও সামাজিক সচেতনাবোধ তেমন না থাকায় পূর্বপুরুষের রেওয়াজ অনুযায়ী ছেলে মেয়েদের খেলার বয়স পার হতে না হতেই বাল্য বিবাহের মত সামাজিক ব্যাধি এখন তাদের মধ্যে রয়ে গেছে যার ফলে ১২-১৩ বছরের মধ্যেই ছেলে মেয়েদের বিয়ে সাদি সম্পন্ন করা হয়। জীবননগর আদিবাসী কল্যাণ সমবায় সমিতির সাবেক সম্পাদক বিষুপদ কর্মকার বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছরে দেশের অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও এখনও পরিবর্তন হয়নি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির ভাগ্য। আমরা রয়েছি সরকারের সু-দৃষ্টির অন্তরালে। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত অভাবের সাথে যুদ্ধ করে কোন রকম টিকে আছি। মনোহরপুর গ্রামে অদিবাসী হিন্দু পরিবারের একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের দ্বাদশ শ্রেনীর ছাত্র পুতুল ও দশম শ্রেনীর ছাত্র রিদয় কুমার জানান, এখানকার শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও অর্থনৈতিক কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত যেতে পারে না। যার ফলে লেখাপড়া ছেড়ে অনেকে শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। মনোহরপুর আদিবাসী কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি দুলাল চন্দ্র কর্মকার ক্ষোপ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন পর ইউএনও সাহেব ও উপজেলা চেয়ারম্যান কয়েকটি পরিবারকে টিউবওয়েল, ল্যাটিন, শুকনো খাবার বিতরণ করলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তিনি আরো বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্কভাতাসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা থাকলেও এগুলোর সুবিধা থেকেও আমরা বঞ্চিত হয়ে থাকি। এ অভিযোগের ভিত্তিতে মনোহরপুর ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন খাঁন বলেন, যে সমস্ত আদিবাসী ভিজিডি ভিজিএফ, বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ অন্যান্য সরকারি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না, তাদেরকে খুব শীঘ্রই ভাতাসহ সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম রেজা জানান, জীবননগর উপজেলায় যে সমস্ত আদিবাসী আছে ইতোমধ্যেই তাদের মাঝে শুকনো খাবার, ঘর নির্মাণের টিন, নিরাপদ টিউবওয়েল, স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাটিন বিতরণ করেছি এবং শিক্ষার দিকেও আমরা নজর দিয়েছি আর ওদের মধ্যে বড় সমস্য বাল্য বিবাহ সেটিও আমরা প্রতিরোধ জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বন্ধ করার কাজ করে যাচ্ছি। উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার আফাজ উদ্দিন জানান, উপজেলার যে সমস্ত আদিবাসী আছে তাদের নামের তালিকা আমরা তৈরি করেছি ইতোমধ্যেই উপজেলার ২৭ জনকে আমরা ভাতা প্রদান করছি। পর্যায়ক্রমে যে সমস্থ আদিবাসী বিধবা ও বয়স্ক আছে তাদের কার্ড দেওয়া হবে। তাছাড়া বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে উপজেলার বেশ কয়েকটি আদিবাসীদের হাতের কাজের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)